আসুন একটু হৃদয়ের যত্ন নেই

হার্ট

“প্রায় বুকে চিন চিন করে ব্যথা করে কবির সাহেবের, তিনি ভাবেন এটা গ্যাস্টিকের ব্যথা হয়ত। তাই দুই টাকা দামের একটা গ্যাস্টিকের ট্যাবলেট খেয়ে সাময়িক ভাবে ব্যথা উপশম করেন।“

আমাদের সমাজে এমন কবির সাহেব আছেন হাজারেরও বেশি। হার্ট অ্যাটাকের আগে কেউ ডাক্তার দেখাতে যায় না। বার বার শরীরের প্রয়োজন কে অবহেলা করি আমারা। ফলাফল হার্ট অ্যাটাক নাহয় মৃত্যু। একটা মৃত্যু বা হার্ট অ্যাটাকের চাপ একটা পরিবারকে যে কতটা ভেঙ্গে ফেলে লিখে শেষ করা যাবে না।

আজ তাই চেষ্টা করলাম এই বিষয় অজানা কিছু তথ্য জানাতে। সব শেষে থাকছে একটি সারপ্রাইজ। আসা করি সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি নিজ স্বার্থে পড়বেন।

হৃৎপিণ্ড আমাদের দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। মাদার বোর্ড ছাড়া যেমন কম্পিউটার চলে না। তেমনই হৃৎপিণ্ড ছাড়া শরীর চলতে পারেনা। কিন্তু ব্যস্ততার বা অবহেলার কারণে শরীরের এ গুরুত্বপূর্ণ অংশটির যত্ন নেওয়ার কথা ভুলে যাই আমরা। বর্তমান সময়ে পরিবেশ যেভাবে দূষিত হচ্ছে, রোগের বয়স এর পার্থক্য কমে যাচ্ছে। যে কোনো বয়সের মানুষেরই হতে পারে যে কোনো রোগ। বিশেষ করে হার্টের রোগ। একটু সতর্ক হলেই কিন্তু এই সব অসুখ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। হার্টের অসুখের ঝুঁকি আপনার জীবনে একটু কমাতে চাইলে কিছু বিষয় অবশ্যই মানতে হবে।

ধূমপানের অভ্যাস থাকলে ছেড়ে দিন। ধূমপান না করলে আপনার হার্টের অসুখের ঝুঁকিও অনেক কমে যাবে। একটু ব্যায়াম করুন। সময় সুযোগ মতো নিয়ম করে করুন ব্যায়াম। হার্টের অসুখের ঝুঁকি কমবে। আপনার উচ্চতা এবং বয়সের সঙ্গে মানানসই এমন ওজন বজায় রাখুন।

হার্ট
ধূমপান বাদ দিতে না পারলে হৃদরোগ হবেই।

ব্যায়ামের উপকারিতা

১।  দেহে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয় ও কোষগুলোকে অক্সিজেন ব্যবহার করতে সহায়তা করে।

২।  হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশিকে শক্তিশালী করে।

৩।  ব্লাডপ্রেশার বা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

হার্ট
রক্তচাপ বেশি থাকলে দ্রুত কমানোর ব্যাবস্থা করুন।

৪। হার্ট ফেইলিওরের উপসর্গ কমায়।
৫। হার্টের পাম্প ক্ষমতা বাড়ায়।
৬। মাংসপেশি, অস্থিসন্ধি ও হাড়কে শক্তিশালী করে।
৭। রক্তনালিতে অতিরিক্ত চর্বি বা কোলেস্টেরল জমা হতে দেয় না।
৮। রক্তের সুগারকে নিয়ন্ত্রণে রাখে ও দেহের কোষের ওপর ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

৯।  শরীরের বাড়তি ওজন কমায়। কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে সহজে ক্লান্ত হওয়া, হাঁপিয়ে যাওয়া ইত্যাদি কমে যায়।

হার্ট
ব্যায়াম শুধু হার্ট না সারা শরীরও ভালো রাখে।

১০। ঘুম স্বাভাবিক ও আরামদায়ক হয়, শারীরিক ও মানসিক অবসাদ দূর হয়।
দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও বিষণ্নতা কমে।

দৈনন্দিন ব্যায়াম এমন কিছু ব্যায়াম আছে, যা ঠিক ব্যায়ামের তালিকায় পড়ে না কিন্তু ব্যায়ামের মতোই শরীরে কাজ করে। এতে ব্যায়ামের মতোই উপকার পাওয়া যায়।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা, লিফটের ব্যবহার যথাসম্ভব কম করা।

হার্ট
ভুলে যান লিফট আর একসিলেটরের কথা।

অল্প দূরত্বে যেতে হেঁটে যাওয়া।
বাড়িঘর পরিষ্কারের কাজ নিজেই করা।

ভুল ধারণা


বয়স্কদের ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। বয়স্ক, প্রৌঢ় সবারই ব্যায়ামের প্রয়োজন আছে। তবে ব্যায়ামের সময় এত বেশি হাঁপিয়ে ওঠা যাবে না,  যাতে কথা বলতে কষ্ট না হয়।
হার্টের অসুখ হলে ব্যায়াম করা যাবে না। হার্টের সমস্যা হলেও ব্যায়াম করা যাবে। শুধু তাই নয়, ব্যায়াম করতেই হবে। তবে কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ অনুসারে ব্যায়ামের সময়, ধরন ঠিক করে নিতে হবে। এমন স্থানে ব্যায়াম করবেন, যেখানে পরিচিত অনেকেই আছেন।
ব্যায়ামের জন্য জিমে যেতেই হবে। ব্যায়াম করতে হলে জিম বা ব্যায়ামাগারে যেতে হবে এমন কোনো  কথা নেই। তবে কোনো হেলথ ক্লাব বা হাঁটার জন্য বন্ধু বা প্রতিবেশী সঙ্গে  থাকলে ব্যায়ামের নিয়মানুবর্তিতা বজায় থাকে। না হলে আলস্যের কারণে অনেক সময় ব্যায়াম বাদ পড়ে।
ব্যায়াম নিয়মিত করলে খাবার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই। হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালি ভালো রাখতে হলে শুধু ব্যায়াম করলেই হবে না,  তেল ও  চর্বিজাতীয় খাবার,  গরু ও খাসির মাংস, মগজ, ডিমের কুসুম, বেশি মিষ্টি, আইসক্রিম, চকোলেট, ফাস্ট ফুড পরিহার করে ব্যালান্সড ডায়েট খেতে হবে।

কিছু খাবার আছে যা আমরা প্রতিদিন খাই কিন্তু এটা জানিনা যে এগুলো আসলে খাবার এর নামে বিষ।

এর ভেতর এক নাম্বার এ আছে কাঁচা লবণ, চিনি দুধ চা, ঘন ডাল। এই খাবার গুলো হার্টের জন্য নীরব ঘাতক।

কিছু সহজলভ্য ও পরিচিত খাবার আছে যেগুলো আমাদের রক্তনালী পরিষ্কার করে আমাদের হার্ট ভালো রাখে।

পানি

জল চিকিৎসা নামে একটি চিকিৎসা পদ্ধতি জাপানী মেডিকেল বোর্ড খুঁজে বের করেছে যা শতভাগ সুস্থতা প্রদানে সক্ষম বলে দাবি করেন তারা।
সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে চার গ্লাস পানি পান করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। প্রথম দিকে এটা অনেক বেশি মনে হলেও কিছুদিন এভাবে পানি পান করলে বিষয়টি সহজেই আয়ত্ত হয়ে যায় এবং উপকারও টের পাওয়া যায়। পানি খাওয়ার অল্প কিছুক্ষণ আর অন্য কিছু মুখে না দেওয়াই ভালো। এ উপায়ের কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এবং এটি পরিপাক ক্রিয়ার জন্য খুবই উপকারী। গবেষকেরা বলেছেন, সকালে খালি পেটে পানি কেবল পাকস্থলী পরিষ্কারই নয়,  শরীরের  বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি থেকেও বাঁচাতে সাহায্য করে।

শাকসবজি ও ফলমূল

 

হার্ট
শাকসবজি হবে আপনার প্রতিদিনের খাদ্য।

সবজি- শিম,  বরবটি, পিয়াজপাতা, পুঁইশাক, মানকচু, কচুরলতি, রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় এগুলো রাখতে পারেন ওষুধ বিবেচনায়ও। মৌসুমি শাকসবজি কিনতে তেমন খরচও হয়না এবং এগুলোতে কীটনাশক কম থাকে।

পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার- প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ক্রমাগতভাবে যুক্ত করতে থাকুন পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ। এ ক্ষেত্রে কলা এবং মিষ্টি আলুকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা।

সবুজ বাহারি সালাদ- খাবারে যদি সবুজ সালাদ থাকে তাহলে আপনার রসনা তৃপ্তির পাশাপাশি হার্টও খুশি থাকবে। তাই বেশি বেশি যুক্ত থাকুন ভিনেগার, জলপাইয়ের তেল কিংবা লেবুর শরবতের সঙ্গে।

আপেল- হার্টের জন্য আপেলকে কার্যকারী ওষুধ বলা যায়। তা ছাড়া কোলেস্টেরলের মাত্রা কম রাখতে আপেল যথেষ্ট উপকারী। যারা প্রতিদিন দুটো আপেল খায়, তাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা অন্যদের থেকে কম থাকে।

হার্ট
প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না।

 

কিছু মজার তথ্য

ডিমের প্রতি ভালোবাসা- যাঁরা বলছেন, বেশি বেশি ডিম খেলে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়ে তাঁদের জন্য দুঃসংবাদ। কেননা ব্রাজিলীয়ান গবেষকরা জানিয়েছেন, ডিমের কুসুমে থাকা ভিটামিন ই, বি-১২ এবং ফলেট করোনারি আর্টারিকে পরিষ্কার রাখে। তবে কেউ যদি দিনে চারটি করে ডিম খেতে থাকেন,  তবে তাঁকে এসব গবেষণার কথা ভুলে যেতে হবে।

হার্ট
ডিম খেলে অনেকক্ষণ ক্ষুধা লাগেনা।

অবসাদ কে দিন বিদায়- কোনোভাবেই কাজের ক্লান্তিকে আপনার ওপর চেপে বসতে দেবেন না। এ জন্য মাঝেমধ্যেই অবসাদ দূর করতে আপনার পছন্দকে গুরুত্ব দিন। সুইজারল্যান্ডের এক গবেষণা জানিয়েছে, অবসাদ দূর করার তৎপরতা হৃদযন্ত্রের সংকট কাটায় ৫৭ শতাংশের কাছাকাছি।

বালিশে মাথা রাখুন সময়মতো যাদের অনিদ্রা নামক রাজরোগ আছে,  তারা অন্যদের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমের জন্য প্রতিদিন বেশি বেশি শারীরিক পরিশ্রম করার আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

অধিক ঘুম কে বলুন “না”- এমনকি যারা বেশি বেশি ঘুমকাতুরে তাদেরও সাবধান করে দিয়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, দিনে ১০ ঘণ্টা কিংবা তার বেশি সময় যাদের ঘুমে কাটে তাদের স্থূলতার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকে, কমতে থাকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। সুতরাং অধিক ঘুম কে না।

হার্ট
অধিক ঘুম হার্টকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

পান করুন গরুর দুধ গরুর দুধে থাকা লো ফ্যাট হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াবিরোধী কম ঘনত্বসম্পন্ন লিপ্রোপ্রোটিনের হার কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি দুধে থাকা ক্যালসিয়াম শরীরে জমে থাকা পুরু চর্বির স্তর কাটতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু দুধচা খাবেন না। বিশেষ করে ভাত খাওয়ার পর দুধচা খাওয়াকে একদম নিষেধ করেছেন বিজ্ঞানীরা।

হার্ট
সপ্তাহে তিন দিন ননি বিহীন দুধ খাওয়ার অভ্যাস করেন।

গান গাইতেই হবে- হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে গলা ছেড়ে গান গাইতেও উৎসাহিত করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, দলবদ্ধ সংগীত কিংবা কারাওকে হাসিখুশি রাখে হৃদযন্ত্রকে।

হাসিখুশি থাকতে হবে- হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত মুখাবয়ব শুধু স্টাইল বা ফ্যাশন আইকনই আপনাকে করে তুলবে না, বাড়িয়ে দেবে আপনার নীরোগ থাকার প্রবণতাও। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রাণবন্ত উপস্থিতি আপনার অবসাদ ও অভ্যন্তরীণ প্রদাহকে ছুটি দিয়ে দেবে এবং অলিন্দ ও নিলয়ের প্রকোষ্ঠকে সুঠাম রাখবে।

হার্ট
হাসি খুশি থাকলে কোন রোগই দেহে বাসা বাঁধতে পারবে না।

এখন সেই সারপ্রাইজ এর পালা।

এটা এমন একটা রেসিপি যা খুব সহজে ঘরে বসে তৈরি করা যায়। এটি একটি মহা ঔষধ। গবেষণায় দেখা গেছে যারা প্রতিদিন এটি পান করে তাদের হার্ট অ্যাটাক এর ঝুঁকি ৯৭% কম।

সারপ্রাইজ রেসিপি

উপাদান

১। আদা

২। রসুন

৩। আপেল সিডার ভিনেগার(সুপারসপ গুলোতে পাবেন)

৪। লেবু

৫। মধু

প্রণালী

মধু ছাড়া বাকি সবগুলো উপাদানের রস বের করতে হবে। আদা, রসুন, লেবু ও আপেল সিডার ভিনেগার সম পরিমাণ নিতে হবে। এখন একটি পাত্রে সব মিশিয়ে (মধু ছাড়া) চুলায় বসিয়ে দিন। মৃদু আঁচে হাল্কা করে জ্বাল দিন। ২০ মিনিট পর নামিয়ে ফেলুন। এটা কিছুটা হলুদাভ বর্ণ ধারণ করবে। চুলা থেকে নামিয়ে মধু মিশিয়ে নিন (যে পরিমাণ আদা, রসুন, লেবু ও আপেল সিডার ভিনেগার নিয়েছেন মধুও সেই পরিমাণ নিতে হবে)। তারপর ঠাণ্ডা করে সংরক্ষণ করুন ফ্রিজে। আপনি এটি ফ্রিজে ১-২ মাস সংরক্ষণ করতে পারবেন।

খাবারের নিয়ম

প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১ টেবিল চামচ ও রাতে ঘুমানোর আগে ১ টেবিল চামচ করে খাবেন। আর ভালো ফলাফল পেতে দুপুরেও খেতে পারেন।

সবাই হৃদয়ের প্রতি যত্নবান হন। যত্নশীল নাহলে হার্ট অ্যাটাকের মত দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *