পিরিয়ড নিয়ে লজ্জা নয়, বাঁচতে হলে জানতে হয়

পিরিয়ড

একটি মেয়ের জীবনে পিরিয়ড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

সাধারণত ৯ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে এটি শুরু হয়ে ৪৫-৫০ বছর বয়স পর্যন্ত স্থায়ী থাকে।

সৃষ্টির প্রথম মানবী থেকে শুরু হয়ে বর্তমানকাল পর্যন্ত সব নারীর এই পিরিয়ড একটি স্বাভাবিক জীবনের অংশ হওয়া সত্ত্বেও এ নিয়ে মানুষের ভুল ধারণার শেষ নেই।

আজকে জেনে নেই পিরিয়ড সংক্রান্ত কিছু ভুল ধারণা

  • অনেকেই ডাক্তারের কাছে আসে খুব অল্প রক্তক্ষরণ সমস্যা নিয়ে। কিন্তু মনে রাখবেন,  পিরিয়ডে রক্তের পরিমাণ নারী ভেদে ভিন্ন। কালচে কয়েক ফোঁটা থেকে শুরু করে গাঢ় লাল হতে পারে। ২০-৬০ মিলি অর্থাৎ ৪-২০ চামচ পর্যন্ত রক্ত যাওয়া স্বাভাবিক।
  • পিরিয়ডের সময় টক-জাতীয় খাবার খেলে বেশি ব্লিডিং হয়। সম্পূর্ণ ভুল ধারণা, এ সময় স্বাভাবিক সব খাবার খাওয়া যাবে। পটাসিয়াম যুক্ত খাবার, আয়রন যুক্ত খাবার এই সময় খাওয়া ভালো। ফল শাকসবজি বেশি করে খাবেন।
  •  পিরিয়ডের সময় হরমোনের পরিবর্তন হয়, ফলে কাজ করতে ইচ্ছে করে না, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, এটা স্বাভাবিক। পিরিয়ড হলে কাজ করা যাবে না এটি একটি ভুল ধারণা। পিরিয়ড একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি কোনো রোগ নয়। এ সময় স্বাভাবিক সব কাজকর্ম করা যাবে। কিন্তু যাদের ব্যথা বেশি হয় তাদের বিশ্রাম নিতে হবে।

পিরিয়ড

  • অনেকে চিকিৎসকের কাছে আসে মাত্র দুদিন পিরিয়ড থাকে এ জন্য ওজন বেড়ে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে পিরিয়ড দুই থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়ে থাকে। নিয়মিত নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর হওয়াটা জরুরি। দুদিন থাকলেই দৈহিক ওজন বেড়ে যাবে এটি মোটেই ঠিক নয়।

কিছু স্বাভাবিক সমস্যা

পিরিয়ডের সময়ে দেহে হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে।

ফলে এই সময় মাথাব্যথা, তলপেটে ব্যথা,  বমি ভাব, খাওয়ায় অরুচি, পায়ের মাংসপেশিতে ব্যথা ও সাময়িক বিষণ্নতা খুব স্বাভাবিক। এসব সমস্যায় খুব বেশি বিচলিত না হয়ে চিকিৎসকের  পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করলেই চলবে।

যে সমস্যা গুলোতে অবশ্যই আমাদের চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে


পিরিয়ড নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবে তিন ধরনের পরিস্থিতিতে
অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ,  এটি তিন ধরনের হতে পারে-
ক) অতিরিক্ত রক্তস্রাব
খ) রক্ত না যাওয়া
গ) পিরিয়ডের মধ্যবর্তী সময় রক্ত যাওয়া
ঘ) অত্যন্ত ব্যথাপূর্ণ পিরিয়ড
ঙ) পিরিয়ড শুরুকালীন সমস্যা

এ সমস্যাগুলো একটু বিস্তারিত জানা দরকার

স্বাভাবিক পরিমাণের চেয়ে ১০-২৫ গুণ বেশি হলেই তাকে অতিরিক্ত বলতে হবে।
এ ধরনের রক্ত যাওয়া মাসিক শুরু ও শেষ হওয়ার সময় কমন। তবে এ ছাড়া অন্য সময় হলে অবশ্যই গাইনি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে  চিকিৎসা নিতে হবে।

এই সময় অবহেলা করলে খুব খারাপ কিছু হতে পারে।

কিছু ভয়ানক রোগের লক্ষণ এই অনিয়মিত পিরিয়ড

  • জরায়ু বা ডিম্বাশয় টিউমার বা সিস্ট
  • থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা
  • লিভার বা কিডনির সমস্যা
  • লিউকোমিয়া
  • রক্ত জমাটের কোনো সমস্যা
পিরিয়ড
আপনার অসাবধানতায় জরায়ুতে হতে পারে অনিরাময় যোগ্য রোগ।

পিরিয়ড শুরুকালীন সমস্যা :

পিরিয়ড শুরুর চার-পাঁচ দিন আগে থেকে শুরু করে সাধারণত প্রথম তিন দিন স্থায়ী হয়।

সাধারণত শতকরা ৩০-৪০ জন নারীই এই সমস্যা ভোগ করে। হরমোনের তারতম্যের কারণে এটি ঘটে থাকে। এই সময়ে-
দুর্বলতা, কাজে অনীহা,  বিষণ্নতা,  সহজে রেগে যাওয়া,  মেজাজের তারতম্য,  হতাশা,  মনোঃসংযোগে ব্যর্থতা ইত্যাদি হয়ে থাকে। এই সময়ে পারিবারিক সদস্যের  সহানুভূতি অত্যন্ত জরুরি।

তবে পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরও যদি এই সমস্যা স্থায়ী থাকে, তবে অবশ্যই একজন মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর অর্থাৎ এর সময় প্রথম কয়েক মাস পিরিয়ড বন্ধও থাকতে পারে। এ নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। তবে এক বছর ধরে পিরিয়ড বন্ধ আছে আবার হঠাৎ পিরিয়ড শুরু হলে অবশ্যই গাইনি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ,  এটি মোটেই স্বাভাবিক নয়। পিরিয়ড কবে শুরু হলো এটি প্রত্যেক নারীর লিখে রাখা বা মনে রাখা প্রয়োজন। স্বাভাবিক নিয়মে জন্মনিয়ন্ত্রণ, গর্ভনিরোধক পিল খাওয়া  অথবা গর্ভধারণের চেষ্টা করা সব ক্ষেত্রেই পিরিয়ড শুরুর দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিরিয়ডের কারণে অনেক নারীরই রক্তশূন্যতা থাকে। তাই প্রতি ছয়  মাস অন্তর একটি হিমোগ্লোবিন করানো উচিত। এটি অত্যন্ত সহজলভ্য ও সস্তা একটি পরীক্ষা। রক্তশূন্যতা থাকলে আয়রন ক্যাপসুল খাওয়া উচিত। পুষ্টিকর খাবার  খাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। আর একটি কথা,  পিরিয়ডের সময় কাউকে ব্লাড দেয়া উচিৎ নয়।

সামাজিক মূল্যবোধ

আমাদের সমাজে পিরিয়ড এখনো একটি টেবু।

মেয়েরা সমস্যা গুলো লজ্জায় বলতে চায় না। সে জন্য প্রতিদিন কত নারী কত জটিল অসুখে ভুগে মারা যাচ্ছে।

নারীরা পুরুষদের কে দোষ দিচ্ছে, কিন্তু নিজের সমস্যার ভাগীদার কি অন্য কেউ হতে পারে?

কাউকে দোষ না দিয়ে নিজের সমস্যা নিজেরই সমাধান করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

যে সব নারীরা চাকরি করেন এবং বিভিন্ন পেশায় আছে, তাদের পিরিয়ড এর জন্য ২ দিন ছুটি দিতে হবে, শ্রমজীবী নারীদের সমস্যা গুলো তাদের ম্যানেজার দের বুঝতে হবে।

ছেলেদের কে নিজেদের ধ্যান ধারনা পরিবর্তন করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। মনে রাখবেন সুস্থ পিরিয়ড মানে সুস্থ নারী, তাই পিরিয়ড কে মর্যাদা দিন। এটি স্বাভাবিক একটি বিষয়, এটি কোন দুর্বলতা নয়।

 

 

One Reply to “পিরিয়ড নিয়ে লজ্জা নয়, বাঁচতে হলে জানতে হয়”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *