পেটের পীড়া ভয়াবহ হতে পারে, অবহেলা করবেন না।

পেটের পীড়া

আমাদের দেশে বেশিরভাগ লোক যে রোগটিতে ভোগেন তা হল পেটের পীড়া। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এ পীড়ার প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। পেটের পীড়া বলতে আমরা সাধারণত বুঝি আমাশয়, ডায়রিয়া, পেটের ব্যথা কিংবা হজমের অসুবিধা।

পেটের পীড়াকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, খাদ্যনালি প্রদাহ (পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, ক্ষুদ্রান্ত্র কিংবা বৃহদান্ত্রের রোগ)। দ্বিতীয়ত, লিভারের প্রদাহ।

খাদ্যনালির কারণজনিত পেটের পীড়াকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

স্বল্পমেয়াদি পেটের পীড়া

দীর্ঘমেয়াদি পেটের পীড়া

আমাশয়

পেটের পীড়া
এন্টাবিমা হিস্টোলাইটিকা নামক জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়।

অ্যামিবিক ডিসেন্ট্রি স্বল্পমেয়াদি পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ যা এন্টাবিমা হিস্টোলাইটিকা নামক জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়। এটি মূলত পানিবাহিত রোগ।

যারা যেখানে-সেখানে খোলা বা বাসি খাবার খেয়ে থাকেন অথবা দূষিত পানি পান করেন তাদের এ রোগ হয়।

শহর অঞ্চলে রাস্তার পাশের খোলা খাবার খেলে এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে যারা যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করেন, কিংবা নদী ও পুকুরের পানি পান করেন তারা এ রোগে আক্রান্ত হন বেশি।

এ রোগের উপসর্গ হঠাৎ করে দেখা দেয়। যেমন- ঘন ঘন পেটে মোচড় দিয়ে পায়খানা হওয়া, পায়খানার সঙ্গে রক্ত বা আম মিশ্রিত অবস্থায় যাওয়া, পায়খানায় বসলে উঠতে ইচ্ছা হয় না বা ওঠা যায় না।

ক্ষেত্র বিশেষে দিনে ২০-৩০ বার পর্যন্ত পায়খানা হতে পারে।

ডায়রিয়া

ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ খাদ্যে নানা ধরনের পানিবাহিত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ।

ছোট শিশুদের ডায়রিয়া সাধারণ রোটা ভাইরাস নামক ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে।

বড়দের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে যে ডায়রিয়া মহামারী আকারে দেখা দেয়, তার অন্যতম কারণ হল কলেরা। শীতকালে কলেরার প্রাদুর্ভাব বেশি হয়।

পাতলা পায়খানা হলে যদি চাল ধোয়া পানির মতো হয় তবে সেটা কলেরার লক্ষণ।

এর সঙ্গে তলপেটে ব্যথা হওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, ঘনঘন পায়খানায় যাওয়া এবং শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া এ রোগের উপসর্গ। এ সময়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

পেটের পীড়ার অন্য কারণগুলোর হচ্ছে পিত্তথলি, পাকস্থলী, অগ্নাশয় এবং অন্ত্রের প্রদাহ।

অগ্নাশয়ের প্রদাহ জনিত পেটের পীড়া

পেটের পীড়ার আরও একটি কারণ হল অগ্নাশয়ের প্রদাহ বা Pancreatitis অগ্নাশয় একটি লম্বা অঙ্গ বা Organ যা পেটের ভিতরে পেছনে অবস্থিত।

এই অগ্নাশয়ের কাজের উপর নির্ভর করে হজমের ক্ষমতা এবং রক্তে গস্নুকোজের পরিমাণ ঠিক রাখা।

স্বল্পমেয়াদী অগ্নাশয়ের প্রদাহ হলে তাকে Acute Pancreatitis বলে, যার অন্যতম কারণঃ

 

পেটের পীড়া
সব সময় ভুঁড়ি ভোজ করা ঠিক না।

ভুঁড়ি ভোজ করা

পিত্তনালী বা পিত্তথলিতে পাথর এবং

অ্যালকোহল পানে আসক্তি

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃদু বা সহনীয় ব্যথা ভাল হয়ে যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসায় বিলম্ব কিংবা অবহেলা করলে জটিল আকার ধারণ করতে পারে এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে।

পাকস্থলি ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহ উপরের পেটে দীর্ঘদিন বার বার ব্যথা হওয়া, Peptic Ulcer রোগের লক্ষণ যা পাকস্থলি Stomach বা ক্ষুদ্রান্ত্রের (Duodenum) এর প্রদাহের কারণে হয়।

এই প্রদাহ দুরারোগ্য ব্যাধি। যাদের হয়, বার বার হয়। রোগীও সারে না, রোগও ছাড়ে না।

এই রোগকে পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ হিসাবে বলা যায়। কেননা আমাদের দেশে ১২% লোক Peptic Ulcer -এ ভুগছেন। এছাড়া যারা অনিয়মিত খান, অতিরিক্ত ধূমপান করেন তাদের এ রোগ বেশি হয়।

লক্ষণের মধ্যে রয়েছে, খালি পেটে ব্যথা, শেষরাতে ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা। এ রোগ সেরেও সেরে উঠে না।

এবারের শেষটায় এসে যে কথা বলতে চাই-খাবারের প্রতি অনীহা, অরুচি, অস্বস্তি, ওজন কমে যাওয়া- এসব কিছুরই অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহ।

এ দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহ এমন আকার ধারণ করে যা কিনা দীর্ঘস্থায়ী জটিল লিভার সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।

পেটের পীড়া প্রতিরোধে করণীয়ঃ

পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলে ভীত না হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

  1. খাদ্য গ্রহণের পূর্বে এবং মলত্যাগের পর নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। যে সমস্ত অভিভাবক শিশুকে খাওয়ান, তারা শিশুকে খাবার প্রদানের পূর্বে এবং শিশুর মলত্যাগের পর একই নিয়মে হাত পরিষ্কার করবেন।
  2. পরিষ্কার পানিতে আহারের বাসনপত্র, গৃহস্থালী ও রান্নার জিনিস এবং কাপড়-চোপড় ধোয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে সাবান ব্যবহার করতে হবে।
  3. পায়খানার জন্যে সর্বদা স্যানেটারী ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে হবে।
  4. যারা গ্রামে বসবাস করেন, তাদের যেখানে সেখানে বা পুকুর নদীর ধারে মলত্যাগের অভ্যাস পরিহার করতে হবে।
  5. খালি পায়ে বাথরুমে বা মলত্যাগ করতে না গিয়ে সর্বদা স্যান্ডেল বা জুতা ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
  6. খাবারের জন্য ফুটানো পানি ব্যবহার করতে হবে এবং পানি ফুটানোর ব্যবস্থা না থাকলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করতে হবে।
  7. আহারের জন্য তৈরিকৃত খাদ্য সামগ্রী এবং পান করার জন্য নির্ধারিত পানি সর্বদা ঢেকে রাখতে হবে।
  8. পুরোনো, বাসী বা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার কখনোই খাওয়া যাবে না।
  9. মনে রাখবেন, পেটের পীড়া প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় পন্থা। আপনি আপনার খাদ্যাভাস, পানি পান, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সর্বোপরি ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হলে পেটের পীড়া থেকে মুক্ত হতে পারবেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *