সত্যিকারের ভালবাসার সন্ধানে

সবাই হয়তো শুনে এসেছেন, ভালবাসার সংজ্ঞা নেই। অনেক মনীষী, মহারথীরাও একই কথা বলেছেন। কিন্তু আমি বলব ভালবাসার সংজ্ঞা অবশ্য আছে। সবাই এর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না বিধায় এই কথা বলে। তাই হয়তো মানুষ সত্যিকারের ভালবাসার সন্ধান পায়না।

ভালোবাসা শব্দটা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। এই কথাটা আমরা ভুলে যাই। বাবা-মার ভালবাসাই আমাদের জীবনের প্রথম ভালবাসার অনুভূতি সৃষ্টি করে। এই লেখাটির মাধ্যমে আমি পাঠকদের বলতে চাই ভালবাসাকে শুধু সম্পর্ক কেন্দ্রিক না করে তার বিশালতাকে জানার চেষ্টা করুন।

বাবা-মা ও সন্তান

পৃথিবী মানুষগুলো এখন আর আগের মত নেই। কারো কাছে এখন কারো জন্য সময় থাকে না। দুঃখের বিষয় অভিভাবকদেরও সময় থাকে না তাদের সন্তানের ব্যাপারে। শুধু টাকাপয়সা দিয়ে দায়িত্ব পূরণ করা যায় না। সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা, তাদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা, পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলের জন্য বকা না দেয়া এই কাজ গুলো করা হয়না। এখানে বাবামারা কিছু ভুল করে ফেলেন। আমি সবাইকে বলছিনা কিন্তু অধিকাংশের ক্ষেত্রে এরকমই হয়। অনেক বাবা-মা আছেন যারা সন্তানের জন্য সব কিছু করেন, অনেক ভালোবাসেন কিন্তু সেই ভালবাসা প্রকাশ করতে পারেননা। যা একদমই ঠিক না। আপনার ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ আপনার সন্তানকে মানসিকভাবে অনেক শক্ত করে তুলবে। কোন পরিস্থিতিতে সে হার মানবে না, তৈরি হয়ে উঠবে আপনার শক্তিশালী ঢাল হিসেবে।

সৃষ্টিকর্তার পর যাদের কাছে আমরা চিরঋণী, চিরকৃতজ্ঞ তারা হলেন বাবা-মা। তাদের ছাড়া আমাদের অস্তিত্বই সৃষ্টি হতোনা। তাদের যত্ন আর ভালবাসা না পেলে আমরা মানুষ হতাম না। বর্তমান সন্তানরা তাদের বাবা-মাকে সেই ভালবাসা ও সম্মানটা দিতে পারেনা যেটা তাদের দেয়া উচিৎ। মমতাময়ী মায়ের আঁচলে বড় হওয়া ছেলে-মেয়েগুলো ভুলে যায় মা না থাকলে তার কি হতো। মা যখন কাজ করে তখন খুব কম সন্তানই আছে তাকে সাহায্য করে। সন্তানের উচিৎ মায়ের সকল কাজে মাকে সাহায্য করা। যে মা সারাদিন কাজ করে তার শরীরের যত্ন নেয়া। একটা বয়সে মায়েদের হাড় ক্ষয় হতে থাকে তার জন্য তাকে ঠিক মত খাবার খাওয়ানো। তার যেকোনো দুঃখের সময় তার পাশে দাঁড়ানো। আমরা তাদের টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করতে না পারলেও মানসিকভাবে শান্তি দিতে পারি। বাবা নামের মানুষ গুলো সারা জীবন আমাদের আগলে রাখতে চায়। তারা কিছুই চায় না সন্তানের থেকে। বাবা-মায়ের মর্ম আমরা বুঝতে পারিনা। অনেকে বুঝতে পারে যখন তারা আর পৃথিবীতে থাকে না। শুধু বাবা অথবা মা দিবসে তাদের ভালোবাসি বলা আমার মতে অন্যায়। যার বাবা-মার সাথে সম্পর্ক ভালো না সে আর যাই করুক না কেন ভাল মানুষ হতে পারবে না। বাবা-মা একটা সময় তাদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মার প্রতি সত্যিকারের ভালবাসা নেই বলেই বৃদ্ধাশ্রম গুলো আজ সংখ্যায় বেড়েই চলছে।

ভাইবোন

বাবা-মার পর সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক হল ভাইবোনের সম্পর্ক। এই সম্পর্কটা আমাদের কঠিন পথে চলতে সাহায্য করে। সত্যিকারের ভালবাসার মূলমন্ত্র হল নিঃস্বার্থতা। যা আমরা এখন ভুলে গেছি। ছোটোবেলায় যখন একসাথে থাকা হত তখন সম্পর্কের গভীরতা বোঝা যায় না। ধীরে ধীরে যখন মানুষ বড় হয় তখন তার মানসিকতা আর মূল্যবোধ পরিবর্তিত হয়। কারো ভাল দিকে হয় আবার কারো খারাপ দিকে। যখন সম্পর্কের ভেতর স্বার্থপরতা চলে আসবে তখনই সেখানে আর ভালবাসা থাকবেনা। ভাইবোনরা একে অপরের সাহায্যকারী। অধিকাংশ ভাইবোনের সম্পর্ক ভেঙে যায় সম্পত্তির ভাগ নিয়ে। সেটা যদিও অনেক নিচু মন মানসিকতার পরিচয় দেয় কিন্তু মানুষ সেটা করতে পিছপা হয় না। আপনারা একে অন্যকে আগলে রাখলে কেউ আপনাদের ক্ষতি করতে পারবেনা।

স্বামী-স্ত্রী

জীবনে জন্ম ও মৃত্যুর সাথে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিয়ে। বাবা-মা, ভাইবোনের সাথে আমরা আজীবন থাকি না। সাধারণত একজন ৭০ বছর বয়সের বিবাহিত মানুষের কাছে যদি জিজ্ঞেস করেন আপনার বৈবাহিক জীবন কতদিনের সে উত্তর দেবে ৪০-৫০ বছর। সুতরাং বুঝতেই পারছেন এই সম্পর্কটি আপনার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনার সাথে থাকবে যা আপনার পরিবার করতে পারবে না। বৈবাহিক সম্পর্ক শুধু কিছু চাহিদা পূরণের জন্য তৈরি হয়নি। এটা তৈরি হয়েছে আপনার সারা জীবনের ভালবাসার জন্য। মানুষ এখন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। একজন আরেকজনের খোঁজ নেয়ার সময় পাননা, ভালবাসাতো অনেক দূরের কথা। যদি স্ত্রী গৃহিণী হয় তবে তাকে কখনই নিচু করে কথা বলা ঠিক না। সে তার নিজের পরিবার ছেড়ে আপনার পরিবারকে নিজের আপন করে নিয়েছে। তার সম্মানের প্রতি খেয়ালটা তাই আপনাকেই নিতে হবে। তাকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া, তার শরীরের প্রতি খেয়াল রাখা আপনার কর্তব্য। সে গৃহিণী বলে সন্তানের দায়িত্ব শুধু তার নয়। আপনাকেও তাদের খেয়াল রাখা উচিৎ। যদি স্ত্রী চাকরিজীবী হয় তাহলে সাংসারিক কাজ গুলো ভাগ করে নেবেন। সন্তানদের দায়িত্বও। মোট কথা ভালবেসে তাকে আগলে রাখুন। জীবোনে সুখী হতে পারবেন।

স্ত্রী হিসেবে একজন মেয়ের অনেক দায়িত্ব থাকে। কারণ সেই তো পরিবারের চালিকা শক্তি। অনেক নারীবাদী নারীরা বলবেন মেয়েরা কেন এতো দায়িত্ব নেবে? একবার ভেবে দেখুন যার সাথে আপনার বিয়ে হয়েছে এবং আপনার সন্তানেরা আপনার জীবনের সব চেয়ে বড় শক্তি। তাদের দেখে রাখা আপনারই দায়িত্ব। আপনি যদি আপনার মমতা দিয়ে আপনার স্বামীকে আগলে রাখতে পারেন তাহলে জীবনের শেষ বয়সের হিসেবের খাতায় অনেক কিছুই লিখতে পারবেন। বেঁচে থাকাটা মনে হবে আশীর্বাদ। একটা পরিবারের কর্তা কখনই একজন পুরুষ হতে পারেনা। সেটা আমার সমাজ বললেও আমি বলবো না। প্রকৃত পক্ষে নারীরাই আমাদের পৃথিবীর চালিকা শক্তি।

পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই, জীবনের প্রতিটি সম্পর্ককে আগলে রাখুন। ভালবাসা না থাকলে সম্পর্ক জীবিত থাকেনা, মরে যায় আকর্ষণ। আপনি যদি কাউকে সবচেয়ে ভাল উপহার দিতে চান তাহলে তাকে দিন, নিঃশর্ত ভালবাসা।

One Reply to “সত্যিকারের ভালবাসার সন্ধানে”

  1. ভালোবাসার সকল মানে খুঁজে পেলাম আপনাদের লিখায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *