সত্যিকারের ভূত দেখার অনুভূতি, গল্প নয়।

ভূত

গাইবান্ধা জেলায় শরিয়তপুর নামের একটা ছোট্ট গ্রাম আছে। গ্রামটার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটা নদী। প্রচুর মাছ পাওয়া যায় সেখানে। গ্রামের মানুষ অনেক মাছ ধরে সেখান থেকে। গ্রামের অন্যতম দুই দস্যু ছেলের নাম হানিফ আর ফরিদ। দুজন সমবয়সী। বয়স ৮/১০ বছর হবে। অনেক দুষ্ট আর দুরন্ত ছেলে দুটো। ঐ নদী থেকে শুধু বাংলা বছরের কার্তিক মাসে মাছ ধরা নিষেধ। ছেলেগুলোর এই মাসেই যেন সবচেয়ে বেশী মাছ ধরতে ভালো লাগে। কারো নিষেধ শোনে না। এই নিশেদ্ধাজ্ঞা যেনতেন কেউ দেয় নি। গ্রামকে বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করে এমন কয়েকজন সাধু সন্ন্যাসীরা নিষেধ করেছে মাছ ধরতে। তখন গ্রামগুলোতে কলেরার প্রাদুর্ভাব ছিল প্রচণ্ড। মানুষ অনেক মারা যেত কারণ কোন প্রতিষেধক ছিল না। যেই বাড়িতে কলেরা হত সেই বাড়িটা হয় কবরস্থান নাহলে শ্মশান হয়ে যেত। তাই মানুষ খুব মানত সন্ন্যাসীদের কথা।

এখন হানিফ আর ফরিদ চুপি চুপি কথা বলছে। কেউ শুনলে যেতে তো পারবেই না সাথে কয়েকটা উত্তম মধ্যম পড়বে পিঠে।

হানিফ- দেখ ভাই সামনের রাস্তা দিয়ে গেলে জালটা নিতে পারব না। বড়শি দিয়ে বেশী মাছ ধরা যায় না।

ফরিদ- ঠিক বলছিস ভাই। আমি বাবার জালটা নিয়ে আসতে পারবো কিন্তু নদীর কাছে নিব কি করে? সেই বুদ্ধি বের কর।

হানিফ- আচ্ছা তুই নিয়ে আয়, বাকিটা আমি দেখছি।

ফরিদ- মার খেতে হবে না তো ধরা পড়ে?

হানিফ- দেখ ভাই আমি কাঁচা কাজ করি না। এখন সবাই দুপুরে খেয়ে ঘুমাচ্ছে সুযোগটা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।

যেই কথা সেই কাজ। ফরিদ চলে গেলো বাবার জাল চুরি করতে। আর হানিফ কীভাবে জালটা নদীর দিকে নেয়া যায় সেই রাস্তা খুঁজতে লাগলো। ২০/২৫ মিনিট পর ফরিদ এলো। বেচারা হাঁপাচ্ছে, দৌরে এসেছে।

ফরিদ- এই নে। জাল অনেক ভারি। আনতে অনেক কষ্ট হইছে আমার।

হানিফ- কষ্ট না করলে ভালো কিছু হয় না। দেখবি আজ কতো মাছ পাই। আমাকে অনুসরণ কর। রাস্তা পেয়েছি।

হানিফ গোয়াল ঘরের দিকে যেতে লাগলো। ওদের গোয়াল ঘরের বাইরেই নদীর রাস্তা। ও জালটা বেড়ার নিচের খালি জায়গা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বের হয়ে নদীর দিকে গেলো।

দুই বন্ধুর আনন্দ দেখে কে। চোখে মুখে বিশ্ব জয়ের হাসি। নদীতে নেমে গেলো জাল নিয়ে। অনেক বেশী মাছ পাবে ওরা দুজন। কারণ কেউ মাছ ধরছে না।

প্রথমে জালটা ছুড়ে দিল নদীতে তারপর ধীরে ধীরে সাঁতরে জালের শেষ প্রান্তে গেলো। জালের ভেতর মাছেরা আওয়াজ করছে।

অনেক মাছ পাওয়া যাবে আজ, সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। জাল তীরে এনে ভেতরে মাছ খুঁজতে গিয়ে দুজনের চোখ চড়কগাছ হয়ে গেছে।

কি অদ্ভুত!! দুজন আবার চেষ্টা করল এবারও একই অবস্থা। এভাবে ৪-৫ বার চেষ্টা করল। খুব বেশী বিরক্ত হয়ে দুজন নদীর পাড়ে দাঁড়ালো। হানিফের কেমন যেন একটা ঠাণ্ডা বাতাস শরীরে লাগলো। চারিদিকে একটা হিম হিম ভাব। হঠাৎ করে হানিফ একটা অপরিচিত ছেলেকে দেখল। ওদের সমবয়সী। ছেলেটা ওদের গ্রামের না, হলে চিনত। ছেলেটা দেখতে কালো আর এতো লিকলিকে যে হানিফ কখন এমন মানুষ দেখেনি। চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বের হয়ে আসবে, চোখের নিচে কালি। চোখ দুটো রক্তলাল। দুই বন্ধুর তখন অনেক মেজাজ খারাপ। ছেলেটাকে দুজন মিলে পাকড়াও করলো।

হানিফ- এই ছেলে তুমি আমাদের জালের মাছ নিয়ে গেছ তাইনা?

ফরিদ- এই তুই কোন এলাকার? নিজে মাছ ধরতে পারিস না?

দুজনে মিলে অনেক কিছু বলল। কিন্তু ছেলেটা কিছুই বলে না। চুপ করে আছে। ফরিদ তখন ওকে মারতে গেলো। হানিফ জলদি ফরিদকে থামিয়ে দিল। মারামারি থামাতে গিয়ে ওর হাত ঐ ছেলেটার কাঁধে লাগলো। হানিফ যেন ছিটকে উঠল। এতো ঠাণ্ডা কোন মানুষের শরীর থাকতে পারেনা। এতো ঠাণ্ডা অনুভূতি ও কখনো পায়নি। হানিফ নিজেও পানিতে ছিল এতক্ষণ। সুতরাং পানিতে থাকলে শরীর যে পরিমাণ ঠাণ্ডা হয় তা এতো অদ্ভুত লাগার কথা না।

ছেলেটা মার খাবার ভয়ে কেমন যেন নেকে গলায় বলতে লাগলো-

আমাকে মেরো না। আমাকে মেরো না। আমি আর মাছ নেব না।

হানিফ- এই ছেলে তুমি এখান থেকে দূরে চলে যাও। ঐ দিকে চলে যাও (হাত দিয়ে ইশারা করলো)। আর কখনো এদিকে আসবে না। এখানে যেন আর না দেখি।

ছেলেটা কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল। আর চলে যেতে লাগলো। হানিফ ফরিদকে ওদিকে তাকাতে মানা করলো। এরপর ওরা আবার মাছ ধরতে জাল ফেলল। এইবার জালে ঠিক আগের মত শব্দ হল। তীরে নিয়ে দেখল জাল ভর্তি মাছ। ঐদিন দুইজনে মিলে অনেক মাছ ধরল।

সবই ঠিক আছে ওদের জীবনে। কিন্তু হানিফ আজও ভুলতে পারেনি সেই শিরশিরে ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা অনুভূতি। আর কোন দিন তাকে দেখেনি। কে ছিল ছেলেটা?? মানুষ নাকি মানুষরূপী…।

(অদ্ভুতুড়ে এমনসব গল্পের জন্য চোখ রাখুন dumurful.com এ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *