কুকুর যখন মানুষের জীবন দানকারী

কুকুর

কুকুর যে মানুষের কত ভালো বন্ধু তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই কুকুর যখন নিজের জীবন বিপন্ন করে মনিবকে বাঁচাতে যায় তখন তাকে শুধু বন্ধু উপাধিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। আসুন দেখে নেই এমন কয়েকজন বন্ধুকে।

খান বাঁচালো কারলটের জীবন

কুকুর

খান নামের একটি কুকুর কারলট নামের একটি ১৭ বছর বয়সী শিশুকে বিষাক্ত সাপের কামড় থেকে বাঁচায়।

মজার বিষয় খান মাত্র ৭ দিন আগেই ওদের বাসায় আসে। খানকে দত্তক নেয়া হয়।

ছোট্ট কারলটকে যখন সাপটি কামড় দিতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে খান ওকে ধাক্কা দেয়। আর বিষধর সাপের কামড় লাগে খানের গায়।

বলে রাখা ভালো সাপটি ছিল কিং কোবরা। মন খারাপ করবেন না। খান বেঁচে যায়। তাকে এন্টি-ভেনম দেয়া হয়।

টাটরটট বাঁচালো মৃত্যুপথযাত্রীর জীবন

কুকুর

এখন যে কুকুররের কথা বলবো ওর নাম টাটরটট। পেটনের মা ক্রিস্টি পরিকল্পনা করলেন টাটরটটকে কিছুদিনের জন্য লালন পালন করবেন।

কয়েক সপ্তাহ পর খেয়াল করলেন যে কুকুরটি তার পরিবারের সাথে অনেক সুন্দর সখ্যতা করে ফেলেছে।

একদিন ক্রিস্টি পেটনকে ঘুম পাড়িয়ে অন্য রুমে বসে ছিল। ১/২ ঘণ্টা পর হঠাৎ করে টাটরটট পেটনের রুমের আশেপাশে দৌড়ানো শুরু করল এবং চিৎকার দিতে লাগলো। ক্রিস্টি কোনভাবেই ওকে থামাতে পারল না, যতক্ষণ না ও পেটনের কাছে গেলো। গিয়ে দেখল পেটন খুব ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার বলল পেটনের রক্তে সুগারের মাত্রা এতো বেশী কমে গিয়েছিলো যে ও মারা যেতে পারতো। টাটরটট ক্রিস্টির সবচেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে গেলো। ক্রিস্টি বলে, এই কুকুর না থাকলে তার সন্তান হয়তো জীবিত থাকতো না।

কুকুর বাঁচালো সুনামি থেকে

কুকুর

বাবু নামের ১২ বছরের এক শিহতজু কুকুর তার ৮৩ বছরের মালিককে সুনামির হাত থেকে বাঁচায়। এটা এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।

হঠাৎ একদিন বাবু তার মালিককে বাইরে নেয়ার জন্য পাগল হয়ে যায়। এমনিতে বাবু বাইরে যেতে বা হাঁটতে পছন্দ করে না।

কিন্তু সেদিন ও তার মালিককে পাহাড়ে পর্যন্ত জোর করে উঠিয়ে নেয়। ওর মালিক যখন পাহাড় থেকে নিচের দিকে তাকায় তখন দেখে সুনামি এসে তার বাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

তার পোষা কুকুর বন্ধুটির জন্য বেঁচে গেলেন তিনি।

কুকুর মনিবের জীবন বাঁচাতে গিয়ে গুলি খেল

কুকুর

কাইলো নামের ১২ বছরের পিটবুল কুকুর। তার মনিবের বাসায় ডাকাত আসে। কাইলো তার মনিবকে বাঁচাতে ডাকাতদের উপর আক্রমণ করে।

ডাকাতরা পালিয়ে যাওয়ার সময় কাইলো ওদের পিছু নেয় তখন ওদের কেউ একজন কাইলোর মাথায় গুলি করে।

অলৌকিক ভাবে কাইলোর মাথায় গুলি লাগলেও তা ঘাড়ের পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। ওর মালিক দ্রুত ওকে হাসপাতাল নেয়।

এবং সৃষ্টিকর্তার দয়ায় কাইলো ৩ দিনের মধ্যে হাঁটতে সক্ষম হয়।

ক্যাটরিনা হ্যারিকেন থেকে বাঁচালো মানুষের জীবন

কুকুর

ক্যাটরিনা নামের কালো লেব্রেডর কুকুর হ্যারিকেনে এক মানুষকে ভেসে যেতে দেখল। মানুষটি ডুবে যাওয়ার আগে তাকে টেনে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায় ক্যাটরিনা। ধীরে ধীরে পানি বাড়তে থাকে। ক্যাটরিনা ততক্ষণ চিৎকার করতে থাকে যতক্ষণ না কোন উদ্ধার কর্মীর দল আসে।

জোজো বাঁচিয়েছে নুমুকে

জোজো নামের একটি বাংলাদেশী কুকুর তার মালিককে গ্যাস বিস্ফোরণের হাত থেকে বাঁচায়। বুদ্ধিমান জোজো সবসময় তাঁর মালিকের সাথেই থাকে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠার পর নুমু (জোজোর মালিক) যখন জোজোর কাছে যায় তখন জোজো তাকে রান্না ঘরে নিয়ে যায়। নুমু রান্না ঘরে গিয়ে আবিষ্কার করেন গ্যাসের চুলা অন করা। শুধু একটি ম্যাচের কাঠি জ্বললেই সেদিন উড়ে যেতো পুরো বাড়ি। জোজোর এতো বড় উপকারে অনেক অনেক কৃতজ্ঞ নুমু। প্রথম ছবিটি জোজো আর নুমুর।

স্টিফেন হকিং, হারিয়ে গেলেন সময়ের ব্ল্যাক হোলে

স্টিফেন

পদার্থবিদ্যা, ব্ল্যাক হোল, কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে আলোচনা করলে যার চেহারা আমাদের চোখে ভাসতো সেই শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং আমাদের মাঝে নেই। জীবনের অর্ধশত বছর তিনি দুরারোগ্য এক ব্যাধির সাথে লড়াই করে বেঁচে ছিলেন।

১৪ মার্চ বুধবার সকালে ক্যামব্রিজে নিজ বাসভবনে মৃত্যু হয় তার। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৭৬ বছর। তার পরিবারের মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

এ বছরই ৮ জানুয়ারিতে তিনি ৭৬ বছর বয়সে পা দিয়েছিলেন।

জেনে রাখা ভালো উনার জন্মদিন ছিল গ্যালিলিও’র ৩০০ তম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে! এবং আইনস্টাইনের জন্মদিন ১৪ মার্চ!!

স্টিফেন হকিং ২১ বছর বয়স থেকেই অসুস্থ ছিলেন

২১ বছর বয়স থেকেই প্রাণঘাতী এএলএস(অ্যামিওট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিস) রোগে আক্রান্ত ছিলেন।

দুরারোগ্য এই ব্যাধি হলে অর্ধেক মানুষ তিন বছর বা তার বেশি সময় বাঁচেন।

২০ শতাংশ বাঁচেন ৫ বছরের বেশি। আর ১০ বছরের বেশি বাঁচতে দেখা যায় মাত্র ১০ শতাংশ মানুষকে। কিন্তু স্টিফেন হকিং বেঁচে ছিলেন পরবর্তী ৫২ বছর।

এই রোগ ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের এবং সুষুম্নাকাণ্ডের স্নায়ুকোষ নষ্ট করে ফেলে। ফলে রোগী সময়ের সঙ্গে মোটোর ফাংশন হারায়, কিন্তু কগনিটিভ ফাংশন বজায় থাকে।

অর্থাৎ সে নড়াচড়া করতে পারে না কিন্তু সুস্থ মানুষের মতো চিন্তা করতে পারেন।

খাবার গিলতে সাহায্য করা পেশী কাজ করা বন্ধ করে দেওয়ার ফলে পুষ্টিহীনতা ও পানিশূন্যতায় মারা যেতে পারেন এই রোগে আক্রান্ত রোগীরা।

স্টিফেন হকিং এর জীবনযাত্রা

কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন ১৯৮৫ সালে। এর পর তিনি কম্পিউটার সিস্টেমের সাহায্যে কথা বলা শুরু করেন।

হকিং নিজের বেশিরভাগ পেশী ব্যবহার করতে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। একটি মোটোরাইজড হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন তিনি।

এমন ভয়ঙ্কর রোগের সাথে বসবাস করেও তিনি জ্ঞান অন্বেষণে ত্রুটি রাখেননি।

স্টিফেন হকিং এর সবচেয়ে বড় সাফল্য

১৯৭০ সালে তিনি সবচেয়ে বড় সাফল্যটি অর্জন করেন। তিনি এবং তার সহ-গবেষক রজার পেনরোজ দেখান একটি মাত্র বিন্দু থেকেই বিগ ব্যাং এর সূত্রপাত এবং সেখানেই আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম।

স্টিফেন

মহাবিশ্বের একটি ভয়ঙ্কর আবিষ্কার হল ব্ল্যাক হোল।

তিনি কোয়ান্টাম থিউরি ব্যবহার করে জানান ব্ল্যাক হোল থেকে তাপ উৎপন্ন হয় এবং তা একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় ‘অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ বইটি।

বইটি ২৩৭ সপ্তাহ ধরে সানডে টাইমস বেস্ট সেলার থাকার কারণে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ঠাঁই পায়।

এখনো এটি পদার্থবিদ্যার অন্যতম জনপ্রিয় একটি বই।

স্টিফেন হকিং এর কিছু উক্তি

সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে

হয়তো সৃষ্টিকর্তা আছেন কিন্তু বিজ্ঞান সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন ছাড়া মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে পারে

নারীর উদ্দেশ্যে

আমার চিকিৎসক সহকারী আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে যদিও আমার পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি আছে, তবুও নারীদের একটি রহস্য থাকা উচিত।

অস্কারজয়ী অভিনেতা এডি যখন তার চরিত্র নিয়ে অভিনয় করেছিলেন

দুর্ভাগ্যবশত, এডি [রেডময়েইন] আমার ভাল চেহারা উত্তরাধিকারী হয়নি।

মৃত্যুর উদ্দেশ্যে

আমি মস্তিষ্ককে একটি কম্পিউটার হিসাবে বিবেচনা করি, যা তার উপাদানগুলি ব্যর্থ হলে কাজ বন্ধ করে দেবে। ভাঙা কম্পিউটারের জন্য কোন স্বর্গ বা পরের জীবন নেই; যে অন্ধকারের ভয় মানুষ পেয়ে আসছে তা শুধু মাত্রই গল্প।

বিজ্ঞানের জগতে তাঁর অবদান কোনদিন নিঃশেষ হবে না। সময়ের ব্ল্যাক হোলে হারিয়ে গেলেন পৃথিবীর উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্কদের একজন।

অপেক্ষা

অপেক্ষা

চুল বাঁধাটা মনের মতো হচ্ছে না বলে আবার বেণী খুলে ফেললো তিথি। স্কুলে যেতে দেরী হচ্ছে দেখে নদী চলে এসেছে। নদী তিথির সবচেয়ে কাছের বান্ধবী।

আজও তোর জন্য দেরী হবে রে তিথি।

আর একটু বস চুলটা বাঁধা হলেই চলে যাবো।

তুই কি ভাত খেয়েছিস?

না, এসে খাবো।

ধ্যাত। তুই রেডি হ। আমি নিয়ে আসি তোর খাবার। খাইয়ে দিলে খাবি তো?

যা যা নিয়ে আয়।

এভাবেই চলছিল তিথির দিন কাল। বয়স ১৪/১৫। কয়েক মাস পর এসএসসি পরীক্ষা শুরু তাই এখন নিয়মিত স্কুলে ক্লাস করে। নদী নামের মেয়েটা ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। নিজের মনের সব কথাই ও নদীর সাথে শেয়ার করে। কালো দেখতে তিথি নামের মেয়েটি পড়াশোনা আর পরিবার-বন্ধু মহল ছাড়া কাউকে নিয়ে কখন চিন্তা করেনি। যদিও ওর বিয়ের জন্য অনেকগুলো প্রস্তাব এসেছিল কিন্তু ও এখন পড়াশোনা নিয়ে কিছু ভাবতে চায় না। ডাক্তার হওয়ার খুব শখ তিথির।

বান্ধবীর সাথে সব সময় হেঁটেই স্কুলে যাতায়াত করে। আজও তাই করল।

তিথি ঐ ছেলেটাকে পরিচিত লাগছে না?

আরে ও তো আমাকে আগে কয়েকবার চিঠি দিয়েছিল। ভুলে গেছিস?

ওহ এটা শফিক ভাই? কিশোরগঞ্জ থেকে রাজশাহী আসে এই লোকটা! শুধু একবার তোকে চোখের সামনে দেখার জন্য এতো দূরে আসেন। ভাবতেই অবাক লাগে রে।

ধুর বাদ দে। ছেলেরা এমন করে। এখন এগুলো পাত্তা দিতে পারবো না। লোকটার দিকে তাকাস না প্লিজ।

শফিক বাইশ/তেইশ বছরের এক টগবগে যুবক। চাকরীর সুবাদে তিথির বাবা কিশোরগঞ্জে গিয়েছিলেন। বাবার জন্য তিথিরও যেতে হয়েছে। তখন থেকেই তিথিকে পছন্দ করে শফিক। তিথি কোন কথার উত্তর দেয় না। তবুও চেষ্টার ত্রুটি নেই ওর। শফিক দেখতে অনেক সুন্দর। নায়ক বললেও কম হবে। হাজার হাজার সুন্দরীরা তার আশেপাশে ঘোরে। কিন্তু তার মনে এই কালো হরিণের কালো চোখ ছাড়া আর কিছুই নেই। তাই তো বার বার ছুটে চলে আসে। তিথিরা এখন রাজশাহী থাকে। শফিকের মন একটু উড়ু উড়ু। তাই পড়াশোনাটা শেষ করা হয়নি। অনেক কষ্টে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। পাশও করেছে ভালো ভাবে। জানে না শফিক কিসের টানে আজও সে তিথির পেছন পেছন ঘোরে। কখনই কি ওর চিঠির জবাব দেবে না তিথি? ভাবতে ভাবতে ওর সামনে চলে আসলো শফিক। আজও ওর হাতে একটা চিঠি।

আপনি আবার কেন এসেছেন? কি চান আপনি?

আমার চিঠিগুলোর জবাব দিলে না তো। কিছুই তো বললে না তুমি। এই চিঠিটা পড়ে আমাকে অবশ্যই উত্তর দিবে।

অনেক সুন্দর লাগছে আজ শফিককে। তিথি না তাকিয়ে পারল না। সত্যি এতো সুন্দর ছেলে সে আগে কখন দেখেনি। মনের বরফ গলে যাবে মনে হচ্ছে তিথির।

আমি আসি তিথি। সামনের সপ্তাহে আবার এই বান্দা তোমার সামনে হাজির হবে।

না চাইতেও হেসে দিল তিথি। সাথে নদীও। এতক্ষণে নদী মুখ খুলল।

শফিক ভাইয়া অবশ্যই আসবেন। আর এই পাজি মেয়ে না আসলে আমি ওকে আপনার কাছে নিয়ে আসব।

তিনজন একসাথে হেসে উঠল। যদিও তিথি ওর হাসিটা লুকানোর চেষ্টা করল।

স্কুল শেষে বাড়ির পথ ধরে আসার সময় সত্যিই বুকটা কেমন করে উঠল শফিকের জন্য। কখন এভাবে ভেবে দেখেনি তিথি। ওর মতো একটা মেয়ে শফিকের কাছে কিছুই না। ইচ্ছে করলেই শফিক অনেক সুন্দরী মেয়ের সাথে প্রেম করতে পারে। তবুও কিসের টানে শফিক ওকে দেখতে আসে?

বাড়িতে ঢুকেই শুনতে পেলো বড় ভাইয়ের চিৎকার চেঁচামেচি। মনটা সাথে সাথে বিষিয়ে গেলো তিথির। কিছুক্ষণ আগে ভালই তো ছিল ও নদীর সাথে। ভালো লাগে না এই বাড়িতে থাকতে। হঠাৎ করে সামনে চলে এলো তিথির বড় ভাই মামুন। খুব রাগী লোক। পান থেকে চুন খসলে গায়ে হাত তুলতে দ্বিধা করেন না তিনি।

তিথি তুই স্কুলে যাওয়ার সময় কার সাথে কথা বলছিলি?

তিথি অনেক বেশি ভয় পেয়ে গেলেও কিছু বলল না।

কি তুই চুপ করে আছিস কেন? কি ভাবিস তুই আমার কানে কোন কথা আসে না? শফিকের সাথে তোর কিসের সম্পর্ক? এতো কিসের হাসাহাসি রাস্তায়?

ভাইয়া আমি কিছু করিনি।

তাহলে ওই ছেলে বার বার আসে কেন এখানে? কি চায় ওই ধূর্ত ছেলে? ও কেমন ছেলে তুই কি কিছু জানিস?

ভাইয়া সে খারাপ লোক না।

তিথির বলতে দেরী কিন্তু ওর ভাইয়ের চড় দিতে দেরী হল না।

এত্ত বড় সাহস তোর? তুই আমার সাথে তর্ক করিস? তোর জন্য বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। ওরা যদি দেখে ফেলত কি ভাবত তাহলে।

রাগের চোটে খুব খারাপ অবস্থা হয়ে গেলো তিথির। রাগের বসে মানুষ অনেক কথাই বলে। তিথি মনের গোপনে রাখা কথাটা বলে ফেললো।

ভাইয়া আমি যদি জীবনে কাউকে বিয়ে করি তাহলে সেটা শফিক। আমি ওকে ভালোবাসি।

তোর কি মাথার ঠিক আছে? তুই কোনদিন ওর সাথে ভালো থাকবি না। ও ভালো মানুষ না।

চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে তিথি। এবার যে চিঠিটা দিয়েছিল সেটার কথা গুলো মাথায় ঘুরছে ওর।

“ তিথি আমাকে তুমি ভালোবাসো আর নাই বাসো আমি তোমাকে সারা জীবন এভাবেই ভালোবেসে যাবো। তুমি আমাকে ভয় পেয়ো না। আমি জানি তোমার পড়াশোনার অনেক ইচ্ছে। তুমি যদি আমাকে বিয়ে করো তাহলে নিজের রক্ত বিক্রি করে হলেও তোমাকে পড়াশোনা করাবো। অনেক ভালোবাসা নিয়ো। আমাকে একটা হলেও চিঠির জবাব দিয়ো ”

এতো চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যেও ওর কথা মনে পড়ে গেলো তিথির। ভাইয়ের কথায় আবার বাস্তবে ফিরে এলো।

কি হল কি ভাবছিস?

বিয়ে করলে আমি ঐ ছেলেকেই বিয়ে করবো।

এসএসসি পরিক্ষার পর দেখতে দেখতে ওর সাথে বিয়ে হয়ে গেলো শফিকের সাথে। হাজার রঙিন স্বপ্ন দেখতে লাগলো তিথি। ধুমধাম করেই বিয়ে হয়ে গেলো ওদের। যদিও বড় ভাইয়ের সম্মতি ছিল না।

শ্বশুর বাড়ীর সবাই অনেক ভালো। স্বামী হিসেবে শফিককে পেয়ে তিথি অনেক বেশী ধন্য। এমন সুন্দর চেহারার ছেলে, ব্যবহার, কথা আর কণ্ঠ এতো সুন্দর। তিথি মুখে যাই বলুক না কেন। ও কিন্তু অনেক বেশী সুন্দরের পূজারী। বিয়ে করে শফিক ওকে কিশোরগঞ্জ নিয়ে এলো। অনেক আত্মীয়স্বজন ছিল শফিকের সাথে। এখন বউকে মায়ের কাছে নিয়ে যাবে।

আম্মা তোমার বউকে দেখ।

তিথি অনেক বুদ্ধিমতী কারো কোন কথার অপেক্ষা না করে টুক করে শাশুড়ির পা ধরে সালাম করে নিলো। কিন্তু খুব স্পষ্ট বোঝা গেলো তিনি তিথিকে মোটেও পছন্দ করেননি। মনটাই খারাপ হয়ে গেল তিথির।

তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়েই শুরু হল তিথির নতুন জীবন। অনেক ভালোবাসা পেলো স্বামীর থেকে। অনেক ভালো শফিক। কিন্তু কয়েকমাস পর দেখল শফিক একদম বাড়ির বাইরে যায় না। আগের মতো ঘুরতে নেয় না। কোন কাজও করে না। শুধু বাসায় বসে থাকে। জিজ্ঞেস করলে বলল,

“আমার কাছে টাকা নেই। কি করবো বাইরে গিয়ে? তুমি কি পারবে আমাকে টাকা দিতে?”

জানে না কি করে এনে দেবে টাকা তবুও বলল,

“আমি এনে দেবো তোমাকে তুমি কি তাহলে স্বাভাবিক ভাবে চলবে? কিছু একটা তো করো।”

“ঠিক আছে তাহলে আমাকে এনে দাও।”

পরের দিন বাড়ীতে চলে গেলো তিথি। বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসলো। ২ দিনের মাথায় শফিক টাকা হাতে পেলো। কত যে খুশি হল শফিক। অনেক বেশি ভালো লাগছে এখন তিথির। সব সমস্যার যেন অবকাশ ঘটল। কিন্তু সে সুখ বেশি দিন সইল না ওর কপালে। জুয়া খেলে সব টাকা হেরে রাগে গজ গজ করতে করতে আবার বাড়িতে বসে রইলো। এভাবেই চলতে লাগলো দিনকাল স্বামীর ঘরে।

একটা লোক এলো সেদিন তিথিকে দেখতে। বলল,

“শফিক নতুন বউকে নিয়ে ঘুরতে বের হও না কেন?”

শফিকের উত্তর শুনে সেদিন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল তিথির।

“আরে ভাই কালো বউকে নিয়ে কি এতো ঘুরাঘুরি করা যায়।”

খুব কষ্ট পেলেও চুপ করে ছিল সেদিন। সেদিন ভালোবাসা কমার কথা থাকলেও কমাতে পারেনি তিথি।

এদিকে শফিক বেকার থাকে বলে সংসারের যাবতীয় কাজ তিথিকে করতে হয়। এক কথায় কাজের বুয়ার সব কাজ। এখানে সবাই একান্নবর্তী পরিবারে থাকে। সুতরাং কিছু না কিছু সবাই দেয় সংসারে শফিক ছাড়া। এতো দিনে অনেক ভয়ঙ্কর একটা জিনিস দেখল তিথি। খুব বদ মেজাজি লোক শফিক। অনেক সময় রাগ হলে হাত উঠে যায় ওর। তিথি বাথরুমে গিয়ে কাঁদে। কাউকে ওর মনের দুঃখের কথা বলে না। মানুষের যে এতো রূপ থাকতে পারে তা ও কখন বিশ্বাস করতে পারে না। ওর ননদ, ননাস, শাশুড়ির সামনেও অনেক সময় অপমান করে কথা বলে ফেলে শফিক।

অনেক সদস্য পরিবারে তাই অনেক রান্না হয়। শাশুড়ি সবাইকে বেড়ে দেন। সবার খাবার শেষ হলে অল্প একটু তরকারি আর ভাঙা মাছ থাকে ওর জন্য। খুব অবাক লাগে তিথির যখন বাড়িতে ছিল তখন ওর মা থালা ভরে তরকারি দিতো আর ও না খেয়ে স্কুলে যেতো। তিথি কিচ্ছু বলে না। অনেক বেশি ভালোবাসে ও শফিককে কোথাও যাবে না ও ওকে ছেড়ে। যত কষ্টই হোক। বড় ভাইয়ের কথা মিথ্যা প্রমাণ করে ছাড়বে।

বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই গর্ভবতী হয়ে গেলো তিথি। অদ্ভুত এক অনুভূতি। অনেক বেশী লাজুক তিথি, তাই সে কারো সামনেও যেতে চায় না এখন। শফিক তো মহা খুশি, ভালো ভাবেই যত্ন নেয় মেয়েটার। অনেক কিছু কিনে দেয় ওকে। কিন্তু মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। চলে গেলো রাজশাহী  কিছুদিন পরই। অল্প বয়সের কারণে তিথির নানান সমস্যা দেখা দিল। ১০ মাস পরই প্রসব ব্যথা উঠলো মেয়েটার। হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার বলল হয় মাকে না হয় বাচ্চাকে বাঁচাতে পারবো। শফিক বলল যে করেই হোক তিথিকে বাঁচান। তিথি বেঁচে গেলেও বাচ্চাটাকে বাঁচানো গেলো না। পাগল প্রায় অবস্থা হল ওর। অনেক বেশি সুন্দর হয়েছিল ছেলেটা। বাচ্চা দেখলেও ভয় পেত ও। কেঁদে ফেলত নিজের অজান্তে। এই সময়টাতে সম্পূর্ণ ভাবে মানসিক সাহায্য দিয়েছে শফিক। অনেক ভালোবাসা দিয়ে ওকে ভোলানোর চেষ্টা করেছে। বলেছে যদি আমাদের কখনো আর বাচ্চা নাও হয় আমার কোন সমস্যা নেই। তুমি শুধু ভালো থেকো তিথি। আমার আর কিছু চাই না। ডাক্তারের পরামর্শে ২ বছর পর একটা টুকটুকে মেয়ে বাবু হল তিথির। চিনির মতো সাদা একটা মেয়ে হল ওর। নাম দিল তুয়া।

দেখতে দেখতে তুয়া বড় হতে লাগলো। শফিক এখন ভালই উপার্জন করে। ভালই আছে পরিবারটা। যখন ও ভালো অনেক ভালো কিন্তু যখন খারাপ তখন এতো বেশি খারাপ ব্যবহার করে যে কোন মানুষ ওর সাথে থাকবে না। তবুও আছে তিথি। তিথির সৌন্দর্য যেন আগের থেকে আরও বেশি বেড়ে গেছে। যদি ও চায় তাহলে অন্য একজনের সাথে ওর বাবা মা বিয়ে দিয়ে দিবে। কারণ উনারা জানেন শফিক খুব একটা সুখে রাখেনি তিথিকে। কিন্তু তিথির পক্ষে এ যে অসম্ভব।

মেয়ের পর একটা ছেলে হল তিথির। অনেক মায়াবী চেহারা ওর। শফিক আজ ভালো হলে কাল খারাপ থাকে। আজ উপার্জন করলে কাল করে না। খুব অশান্তিতে আছে ও। কিন্তু কখনো ছাড়ার কথা ভাবতে পারে না। অপেক্ষায় আছে কবে লোকটা ওর ভালোবাসা বুঝতে পারবে।

অদ্ভুত ব্যপার ওদের বিয়ে হয়ে ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবসে। কোন পরিকল্পনা ছিল না। এমনিতেই মিলে গেছে। আজও তেমন একটি ১৪ তারিখ এসেছে। ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। সংসারও চলছে, শফিক আজও তেমনই আছে। কোন পরিবর্তন আসেনি ওর ভেতর। তিথিও পরিবর্তন করতে পারেনি নিজেকে। এখনো পাগলের মতো ভালবাসে লোকটা। অপেক্ষায় আছে কোনদিন হয়তো বুঝতে পারবে ও কতটুকু ভালবাসে শফিককে। এই লোক ছাড়া ওর পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। যে যাই বলুক, এই রাজপুত্রের জন্য ও আজও সব করতে পারে।

শফিকরা কি কখনো ভালো হবে। বুঝতে পারবে তিথিদের মনের কথা???

অপেক্ষায় রইল তিথি, অপেক্ষায় রইলো সবাই।