ড্রাগন রাজ্যে ভুটান, পৃথিবীর মধ্যে আরেকটা সুন্দর পৃথিবী।

সকাল তখন প্রায় সাড়ে ছয়টা। দরজা খুলে বাহিরে তাকালাম। হঠাৎ করেই আমার মনে হলো আমি কি এখন স্বর্গে? ঘুমের ঘোর তখনও ভালো ভাবে কাটেনি। ঘুম ঘুম চোখে চারদিকে তাকাচ্ছি আর ভাবছি এটা কি স্বর্গ। সূর্য্য কেবলেই পুব আকাশে উকি দিচ্ছে। চারদিকে পাহাড় আর পাহাড় তারমধ্যে একপাশে কল কল ছন্দে বয়ে চলেছে পাহাড়ী নদী। আঁকা বাঁকা পাহাড়ী রাস্তাতে ছুটে চলেছে ঘোড়ার দল। পেছনে সুন্দরি পরিচালিকা। চারদিকে গোলাপের সমারোহ। বিভিন্ন রকমের বড় বড় রং বেরং এর গোলাপ। দুরের পাহাড়াটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ দেখলাম পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে সাদা ধবধবে একটা মন্দির। চারদিকে মিস্টি শীতল বাতাসে এক অপূর্ব মাদকতা। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য্য, নদীর কল কল শব্দ আর মাতাল বাতাসের শিহরণে ঘুমার্ত চোখে বিভ্রান্ত আমি ভেবেছিলাম এটাই বোধহয় স্বর্গ। কিছুক্ষন পর যখন পেছনে তাকালাম আর পরিচিত মুখটি দেখে বুঝতে পারলাম, না স্বর্গে দুজনে এক সাথে থাকার সম্ভাবনা কম। তার মানে আমরা এখনো পৃথিবীতেই আছি। 

ঘুমের রেসটা কাটতেই মনে পড়ল আরে কাল রাতেতো আমরা ভূটানে এসেছি। পাহাড়তো আগে ঘুমায় আগে জাগে । রাতেতো চারদিকে দেখতে পাইনি তাই ভূটানের সৌন্দর্য্য সম্পর্কে গত রাতে তেমন কিছু বোঝতে পারিনি। যাই হোক এই সকালের সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে গত প্রায় দেড় দিনের যাত্রা পথের ধকল ভুলে মনটা সতেজ হয়ে উঠল। আমরা তখন টাইগার হিলস রিসোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে। আর সামনে যে সাদা পাহাড়ের মাঝখানে সাদা মন্দিরটি দেখতে পাচ্ছি সেটিই হল টাইগারস্ নেস্ট। স্থানীয় লোকদের কাছে যা পারো তাকসাং নামে পরিচিত। আর যে শহরে আমরা আছি এটা হলো ভূটানের পারো শহর। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যে আচ্ছাদিত এই পারো। যে দিকেই তাকাই কেবল প্রকৃতির অপার সৌন্দের্য্যের সমাহার। 

টাইগারস্ নেস্ট, পারো, ভুটান

সৃষ্টি কর্তার একটি নিখুত সৃস্টি এই ভূটানকে বলা যেতে পারে। সৃষ্টি কর্তাকে অশেষ ধন্যবাদ আমাকে এত সুন্দর একটা সকাল দেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। স্বর্গ নরক বলে সত্যি কিছু আছে কিনা তা আমি জানিনা তবে একটি স্বর্গীয় মুহুর্ত আমি অনুভব করেছি এটা বলতে পারব। এবার শহর দেখার পালা। বের হলাম শহর দেখতে। এবার আমাদের গন্তব্য চেলালা পাস । 

ভূটান ভ্রমনের একটি সকালের বর্ননা দিয়েই লেখাটি শেষ করছি, কারন ভূটান সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ননা করতে গেলে পুরো একটা বই লেখা সম্ভব। ভূটান ভ্রমনের সুবিধার্থে কিছু উল্লেখযোগ্য জায়গার নাম গুলো দিয়ে দিচ্ছি। আশা করছি আপনাদের ভালো লাগবে।

পারোর কিছু উল্লেখযোগ্য জায়গা:

১. টাইগারস্ নেস্ট
২. পারো জং
৩. ন্যাশনাল মিউজিয়াম
৪. পারো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট
৫. রিংপুং জং
৬. কুচু লাখাং
৭. চেলালা পাস
৮. হা ভ্যালি

থিম্পুর (ভূটানের রাজধানী) কিছু উল্লেখযোগ্য জায়গা:

১. বৌদ্ধা পয়েন্ট (২৫ হাজার বৌদ্ধ মূর্তি এখানে রয়েছে)
২. মেমোরিয়াল চর্টেন
৩. ক্লোক টাওয়ার
৪. কিংস্ প্যালেস
৫. ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম
৬. ন্যাশনাল লাইব্রেরি (বিশ্বের সব থেকে বড় এখান থেকে প্রকাশিত)
৭. তাসিকো জং
৮. ন্যাশনাল জু
৯. বোটানিক্যাল গার্ডেন
১০. থিম্পু জং 

পুনাখার কিছু উল্লেখযোগ্য জায়গা:

১. দোচালা পাস (পুনাখা যাওয়ার পথে অবস্থিত)
২. পুনাখা জং (ভুটানের সব থেকে গুরুত্বপূর্ন মন্দির)
৩. সাসপেনসন ব্রিজ
৪. রিভার রাফটিং 

ফোবোজিখা, ওয়াংন্ডু ফোদ্রাং, ভুটান

রুট প্লান:

বাইরোডে যেতে চাইলে, ঢাকা থেকে বুড়িমারি (বাংলাদেশ বর্ডার)/ চেংড়াবান্দা (ভারত বর্ডার)। ইমিগ্রেসন শেষে কার অথবা জীপে করে ডুয়ার্সের চা বাগান এবং জলদা পাড়া ফরেস্ট দেখতে দেখতে আড়াই ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে জয়গাঁ (ভারত বর্ডার) / ফুয়েন্টসোলিং (ভূটান বর্ডার) সীমান্তে । চাইলে ফুয়েন্টসোলিং শহরে এক রাত্রি যাপন করা যেতে পারে। সকলের সুবিধার্থে জানাচ্ছি যে ভুটানে তেমন কোন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই। জীপ, কার বা টেক্সি যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম।

প্রথমে ফুয়েন্টসোলিং থেকে থিম্পু্ যাওয়া যেতে পারে।  থিম্পুতে এক-দুই দিন ঘুরে ওখান থেকে পুনাখা পারমিসন নিয়ে চলে যেতে পারেন পুনাখায়। পুনাখা ঘুরার শেষে চলে যেতে পারেন পারো শহরে। পারো থেকে হা ভ্যালি গিয়ে একদিনেই ঘুরে আসতে পারেন। পারো ঘোরা শেষে আবার চলে আসবেন ফুয়েন্টসোলিং বর্ডারে। 

হোটেল এবং খাবার সংক্রান্ত তথ্য:

ভূটানে হোটেল খুবই সহজলভ্য। খুব সহজেই ২ থেকে ৩ এর মধ্যে পেয়ে যাবেন বাজেট হোটেল এবং সার্ভিস মান সম্পন্য । তবে প্রথম দিনের  হোটেল বুকিং করে যাওয়া সব থেকে ভালো। বুকিং স্লিপ আপনাকে ভূটান বর্ডারে পারমিশন পেতে সহায়তা করবে। 

খাবারের ব্যাপারে যে বলবো, ভূটানিজরা তেল, ঝাল এবং মসলা ছাড়া খাবার খায়। খাবারে মাখনের উপস্থিতি বেশি। যদি ভূটানিজ খাবার খেতে সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে আপনি ইন্ডিয়ান রেস্টু্রেন্ট গুলোতে যেতে পারেন। 

এছাড়াও রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য ঝর্না ও মেঘের দেখা মিলবে। বিশেষ কিছু জায়গাতেতো মেঘের ভিতর দিয়েও ভ্রমন করতে পারবেন। পশুপ্রেমিকদের জন্য ভূটানকে স্বর্গ রাজ্য বলা যেতে পারে। কারন ভূটানে পশু-পাখি হত্যা নিষেধ এবং এমন কিছু করা যাবেনা যাতে পশু-পাখিদের কোন রকম সমস্যা হয়।

যাইহোক, এখানেই শেষ করছি। তবে যেটা না বললেই না, সেটা হলো ভূটানীজরা অনেক পরিবেশ সচেতন। তাই ভূটান ভ্রমনের সময় যেন আমরা যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা না ফেলি বা এমন কিছু না করি যাতে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি খুন্ন হয়। আপনাদের ভ্রমন শুভ হোক। এ কামনা রইল।

নাগাল্যান্ডের লংওয়া গ্রাম ভ্রমনের অভিজ্ঞতা!

এবারে আমাদের নাগাল্যান্ড ট্যুরটা ছিলো অন্যান্য সব ট্যুরের থেকে আলাদা । কোন কিছু তেমন জানা নাই, মনে হচ্ছিলো অজানা কোন গন্তব্যে আমরা আগাচ্ছি । শুধু লোকলদের কাছে হেল্প নিয়ে চলতে হয়েছিলো । অর্ধেক বাংলা, অর্ধেক ইংরেজি এবং কিছু হিন্দি এভাবে মিক্স করে আমাদের চলতে হচ্ছিলো । এভাবে প্রায় প্রতিটি স্টেপে নতুন নতুন এক্সপেরিয়েন্স আমাদেরকে ধরা দিচ্ছিলো ।

এভাবে নাগাতে কিছুদিন এদিক সেদিক ঘুরে এবারে আমাদের গন্তব্য ছিলো একটি গ্রাম । নাগাল্যান্ড মন জেলার সর্বশেষ এবং সব থেকে বড় গ্রামটি হলো লংওয়া । গ্রামটির অবস্থান ভারত-মায়ানমার বর্ডারে । গ্রামটিতে যুগ যুগ ধরে রাজার শাষন চলে আসতেছে । শুধু এই গ্রামেই না নাগাল্যান্ডের সব গ্রামেই রাজা আছে । এই গ্রামের বিশেষ বৈশিস্ট্য হলো গ্রামটির কিছু অংশ ভারতে এবং কিছু মায়ানমারে । মজার ব্যাপার হলো এই গ্রামের যে রাজা তার বাড়ির অর্ধেক অংশ ভারতে এবং অর্ধেক মায়ানমারে ।

নাগাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বহন করে এমন কিছু জিনিস |

এই গ্রামের মানুষজন পাসপোর্ট-ভিসার কোন ঝামেলা ছাড়াই দুই দেশে যাতায়াত করতে পারে (তবে তাদের একটা নির্দিস্ট সীমারেখা মনে হয় আছে) । লোকালদের কাছে শুনেছি এই গ্রামের কিছু যুবক মায়ানমার আর্মিতেও চাকরি করতেছে ।

এই গ্রামের রাজা খুব শক্তিশালী । প্রায় ৭০ টার মত গ্রাম ওনার রুলসে চলে । এগুলোর মধ্যে বেশির ভাগেই গ্রাম মায়ানমারের মধ্যে! এই রাজা এতই শক্তিশালী যে ওনার পত্নীর সংখ‍্যা ৬০ জনের মত । বলে রাখা ভালো যে নাগাদের মধ্যে হেড-হান্টারদের পত্নী বেশি হয় । কারন যে যত শত্রুর মুন্ডুছেদ করতে পারে সে তত বেশি শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তাদের কালচার অনুযায়ী বিবাহের জন্য পূর্বশর্ত পূরন হয় ।

লংওয়া গ্রামের রাজার বাড়ি । বাড়ির মাঝ বরাবর বাম দিকের অংশটা মায়ানমার এবং ডান দিকের অংশটা ভারত ।

এই গ্রামে যাওয়া আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো হেড-হান্টারদের সাথে সাক্ষাত করা । নাগাল্যান্ডের সব থেকে বেশি হেড-হান্টারদের বাস এই গ্রামেই । আনুমানিক ১০০ জন বা তারো বেশি ।

গ্রামটি বড় হবার সুবাধে এখানে বৈচিত্রতাও অনেক বেশি। অনেক কিছুর দেখা মিলবে এই গ্রামে । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা নাহয় নাই বললাম 😉 যদি সময় হাতে থাকতো তাহলে এখানে আরো একটা দিন থাকার খুব ইচ্ছা ছিলো ।

যুদ্ধে ব্যবহৃত কিছু অস্ত্র এবং শিকারকৃত কিছু জন্তুুর মস্তক ।

আমাদের রুট ছিলো:
ডাউকি –> সিলং (কার ভাড়া ১২০০ রুপি)
সিলং –> গোহাটি (কার ভাড়া ১২০০ রুপি )
গোহাটি –> ডিমাপুর (ট্রেনের এসি স্লিপারে ৭০০ রুপির মত পার পারসন)
ডিমাপুর –> কহিমা (কার ভাড়া ১৩০০ রুপি)
কহিমা থেকে যেখানে যাবেন সেই অনুযায়ী প্লান করবেন । সারাদিনে কার ভাড়া ২০০০ থেকে ২৫০০ রুপির মত লাগে ।

কহিমা থেকে লংওয়া যাওয়ার রুট:
কহিমা –> মন শহর (বাসে ৬০০ রুপি পার পারসন)
মন শহর –> লংওয়া গ্রাম (সুমোতে ৩০০ রুপির মত পার পারসন)

বিশেষ অনুরোধঃ দয়া করে যথাস্থানে ময়লা ফেলুন,পরিবেশ সুন্দর রাখুন, লোকালদের খারাপ লাগে এমন কিছু করবেননা ।
সবার ভ্রমন হোক নিরাপদ এবং উপভোগ্য