যারা বলেন বাংলা সিনেমাতে কিছু নেই এই সিনেমাগুলো তাদের জন্য

বাংলাদেশের সিনেমা ব্যবস্থা নিয়ে আমরা অনেক হতাশ। খুব বিরক্ত আমরা। অনেক ভালো ভালো সিনেমা হল আজ ধ্বংসের পথে শুধুমাত্র ভালো সিনেমা নেই বলে। কিন্তু যারা এই বিরক্ত থেকে একদম বাংলা সিনেমা দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন তাদের জন্য রয়েছে বাংলা কিছু সিনেমার রিভিউ। আশা করি আপনারা অনুপ্রাণিত হবেন।

আয়নাবাজি

সিনেমা
আয়নাবাজি

২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া একটি অপরাধধর্মী থ্রিলার সিনেমা। মূল চরিত্রে আছেন চঞ্চল চৌধুরী। সিনেমাটির পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী। বরাবরই আমরা এই বরেণ্য পরিচালকের কাছ থেকে চমৎকার সব সিনেমা উপহার পেয়ে আসছি। আয়ণাবাজিও সেই ধারার উপর বহমান একটি সিনেমা। এখানে এক শহরের গল্প বলা হয়েছে। এই শহরে সকালে দুধওয়ালা আসে, ফেরিওয়ালারা হাঁকডাক দেয়, বাচ্চারা দল বেঁধে নাটক শিখতে যায়। আয়না সেই শহরের একজন বাসিন্দা। অভিনয় যার নেশা। বাচ্চাদের নাটক শেখায়।

হৃদি নামের এক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়, পরে তা প্রেমে রূপ নেয়। পাল্টাতে থাকে আয়নার জীবন। সে আটকে যায় নানা রকম মুখোশে। একসময় ফিরে আসতে চায় মহল্লার অতি চেনা আয়না হয়ে। কিন্তু ফেলে আসা প্রেম ও নাটকের স্কুলে ফিরে যেতে পারে না সে। অপরাধ জগতে আটকে যেতে থাকে আয়না। সে কি ফিরতে পারবে। জানতে হলে দেখে নিন। ১৯তম মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ছয়টি বিভাগে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় ও তিনটি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। এছাড়া ছবিটি সিয়াটল সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এবং ১৬তম টেলি সিনে পুরস্কারে সেরা ছবির সম্মান লাভ করে।

অজ্ঞাতনামা

সিনেমা
অজ্ঞাতনামা

সিনেমাটি ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া আর একটি অনবদ্য সিনেমা। পরিচালককে আপনারা ক্যামেরার সামনে অনেক কাজ করতে দেখেছেন কিন্তু তিনি ক্যামেরার পেছনেও যে কতোটা প্রতিভাধর তা জানতে হলে সিনেমাটি দেখে নিন। এখানে সেই মানুষদের গল্প বলা হয়েছে যারা নিজেদের সব সম্পতি বিক্রি করে লাশ হয়ে দেশে ফিরে নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশ যাওয়া মানুষদের মাঝে কেও যখন মারা যায়, তখন তার লাশ এই দেশে আসলে সেটা নিয়ে কি কি সমস্যা হয়  এবং এই এক লাশকে কেন্দ্র করে কীভাবে আমাদের দেশের আদম ব্যবসা থেকে শুরু করে উপরের মহলের মুখোশ উন্মোচিত করা হয়েছে- সেটা দেখবেন এই সিনেমা। চলচ্চিত্রটি ইতালির গালফ অফ ন্যাপলস ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে ২১ মে প্রদর্শিত হয় এবং জুরি স্পেশাল মেনশন পুরস্কার অর্জন করে।

কৃষ্ণপক্ষ

সিনেমা
কৃষ্ণপক্ষ

হুমায়ূন আহমেদের লিখিত এই গল্পটি কম বেশি সবার পড়া আছে। কিন্তু তা যদি সিনেমায় রূপ ধারণ করত তাহলে কেমন হত?

এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন কৃষ্ণপক্ষের পরিচালক মেহের আফরোজ শাওন। ‘

হুমায়ূন আহমেদের পর কেউ যদি তার চলচ্চিত্রের ধারা ধরে রাখতে পারে তাহলে তা শাওন ছাড়া আর কেও নন।

সিনেমাটি নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না।

নায়ক হিসেবে ছিলেন রিয়াজ, তাঁর অভিনয় তো বরাবর দেখে আসছি কিন্তু নায়িকা হিসেবে মাহীয়া মাহি ছিল একটি চমৎকার নির্বচন।

ড্রেসিং টেবিল

আবু সাইয়ীদ পরিচালিত ২০১৬ সালের রহস্য চলচ্চিত্র। ছবিটির কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন পরিচালক আবু সাইয়ীদ নিজেই।  ছবিটি প্রযোজনা ও পরিবেশনা করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম

শিলা আর রুহুল সম্প্রতি বিয়ে করেছে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অভাব অনটনের সংসার। গুছিয়ে তুলতে পারে নি অনেক কিছু। গৃহস্থালীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস এখনো কেনা হয় নি তাদের।

তেমনি একটি আসবাব হল ড্রেসিং টেবিল। একদিন রুহুল একটি পুরাতন ড্রেসিং টেবিল নিয়ে বাড়িতে ফিরে। শিলা খুশি হয়।

পরে পরিস্কার করতে গিয়ে ড্রয়ারে সে একটি পুরনো ডায়েরি পায়। প্রথমে একটু সংকোচ বোধ করলেও পরে এক রাতে সে ডায়েরিটা পড়া শুরু করে।

২-৩ পৃষ্ঠা পড়ার পর কৌতূহল থেকে সে পুরো ডায়েরি পড়ে। ডায়েরি পড়ে সে অনেক কিছু জানতে পারে এবং পড়া শেষে সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে যায়।

সে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে আবিস্কার করে। শুরু হয় তার নতুন জীবন।

এতক্ষণ বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে বলছিলাম এখন আসুন যেনে নেই ওপার বাংলায় সিনেমার কি হাল।

ডবল ফেলুদা

সিনেমা
ডবল ফেলুদা

পঞ্চাশ বছর হয়ে গেছে গোয়েন্দা প্রদোষচন্দ্র মিত্রের। এই পঞ্চাশ বছরে ফেলুদার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য ডবল ফেলুদা।

যে দুটো গল্প এবার পরিচালক সন্দীপ রায় বেছেছেন- ‘সমাদ্দারের চাবি’ আর ‘গোলকধাম রহস্য’- দুটোই সত্যজিত্ রায়ের অত্যন্ত প্রিয় গল্প৷

ছবির আঙ্গিকও চমত্কার৷ ইন্টারভ্যালের আগে ‘সমাদ্দারের চাবি’৷ পরে ‘গোলকধাম রহস্য’৷

যদিও এমন আঙ্গিক সন্দীপ রায় ‘চার’ এ রেখেছিলেন, তবুও ফেলুদার ছবির প্রেক্ষিতে এটি প্রথম৷ সব মিলিয়ে ছিমছাম ১০২ মিনিটের টানটান উত্তেজনা৷

ছবির সব থেকে বড় গুণ ‘সিমপ্লিসিটি’৷ এবং আদ্যন্ত সাবলীল বাঙালিয়ানা৷ যেটা সন্দীপ রায়ের ফেলুদা ছবিতে থেকে থাকে৷

তা সত্ত্বেও বলতে হয় সেই সাবলীলতার ছাপ রজনী সেন লেনে গোয়েন্দার বসার থেকে শুরু করে প্রত্যেক চরিত্রের পোশাকে , কথাবার্তায়, চলাফেরায়, ব্যবহারে বিদ্যমান৷

কোথাও এক ফোঁটা বাড়াবাড়ি নেই৷ এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে এই সমস্তটা গিয়ে ফিল্টার হয় বিশ্বাসযোগ্যতায়৷

সিনেমাটি দেখতে হলে আপনাকে ক্রিসমাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সিনেমাওয়ালা

ছোট্ট এক শহরের সিনেমা প্রদর্শক প্রণবেন্দু দাসকে (পরাণ বন্দোপাধ্যায়) ঘিরে ‘সিনেমাওয়ালা’র কাহিনি গড়ে।

সিনেমার মূল চরিত্র হচ্ছে “কমলিনী” নামের সিনেমাহল যার কোন কদর নেই পাইরেটেড ডিভিডি ডিস্ক এবং ডিজিটাল থিয়েটার বা প্রজেক্টরের কারনে। আগের দিন ফুরিয়ে গেছে।

প্রণবেন্দুর নিজের ছেলেই (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) পাইরেটেড ডিভিডি ডিস্ক স্বল্পদামে কিনে বিক্রি করে। তাই নিজের ছেলের সাথে তার মনোমালিন্য।

কেননা প্রণবেন্দুর ধারণা এভাবে পাইরেটেড ডিস্ক বিক্রির কারণেই মানুষ হলে গিয়ে ছবি দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এবং হলগুলো অচল হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে তার নিজের হল কমলিনীও অচল।

একসময় প্রণবেন্দু কমলিনীর প্রজেক্টর বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রণবেন্দুর সহচারী হরি। যিনি এই হলের একজন প্রজেকশনিস্ট ছিলেন।

২৩ বছর বয়স থেকে কমলিনীর প্রজেক্টর চালান। এই প্রজেক্টর তার সন্তানের মত।

তার সন্তান তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সন্তানকে জড়িয়ে ধরে আছেন তিনি।

একটু পরই সন্তান চলে যাবে। সন্তানের শোকে হরি প্রজেকশন রুমে আত্মহত্যা করেন।

তার এই আত্মহত্যা গল্পের মোড় কোনদিকে ঘুরায় জানতে হলে দেখুন “সিনেমাওয়ালা”

শঙ্খচিল

সিনেমা
শঙ্খচিল

একটি পরিবারের অসহায়ত্ব দিয়ে গোটা বাংলার হৃদয়ের ক্ষত উঠিয়ে আনতে চেয়েছেন নির্মাতা গৌতম ঘোষ তার শঙ্খচিলের মাধ্যমে।

পরিবারটির গল্পের পাশাপাশি আরো নানা ভাবেই উদ্ভট দেশভাগের কথা এসেছে ছবিতে।

আর মূল গল্পের পাশাপাশি ডকুমেন্টারী আকারে আসা দেশভাগের দৃশ্যপট ছবিটিকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। ছবির চিত্রনাট্য হয়তো একটু বেশীই সরল; তবে শক্তিশালী বর্ননা ছবিকে ভিন্নতার স্বাদ দিয়েছে।

বিশেষ করে চরিত্রের ভাব প্রকাশে মাঝে মাঝে বাংলা কবিতা এবং গানের ব্যাবহার; কিংবা প্রকৃতিকে বার বার বিষন্ন রুপে নিয়ে আসা এক কথায় অসাধারন ছিলো। ছবির চিত্রায়ন বা সিনেমাটোগ্রাফী কিছু কিছু যায়গায় চোখ এবং মন দুটোই জুড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে বাংলার সরল প্রকৃতিকে এমন সুন্দর ভাবে পর্দায় দেখে। আর অসম্ভব সুন্দর সম্পাদনা তো আছেই। ছবির ডায়লগ খুব অসাধারন কিছু না হলেও চলনসই ছিলো। কবিতা আর গানের ব্যাবহার ডায়লগের সাধারনত্বকে ঢেকে দিয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছবির পরিবেশকে ভালোভাবেই ফুটিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। দেশভাগের আর্তনাদ যে এখনো শেষ হয়নি বরং বাঙ্গালী জাতিটিকে এই আর্তনাদ বয়ে বেড়াতে হবে আরো অনেক অনেক কাল; শঙ্খচিল যেন তারই গল্প বলে যায়।