ডিপ্রেশন নিয়ে অবহেলা করলে পরিণতি হতে পারে “মৃত্যু”

ডিপ্রেশন

মানব শরীর নানা রোগের আধার। ভয়ঙ্কর সব রোগ নিয়ে হয়তোবা আপনার আশেপাশের মানুষগুলো বেঁচে আছে। কিছু কিছু রোগ আছে দেখা যায় না কিন্তু এর ভয়ঙ্করের মাত্রা অনেক বেশি। ডিপ্রেশন তেমনই একটি রোগের নাম। দিন দিন এই রোগ প্রকট হয়ে উঠছে। আমাদের দেশে এ নিয়ে তেমন কোন জনসচেতনতা নেই বললেই চলে। কারণ মানসিক সমস্যা অথবা রোগকে কোন রোগ বা আসুস্থতা বলে গণ্য করা হয় না। কিন্তু প্রতি বছরই এর কারণে অনেক মানুষ আত্মহত্যা করছে।

কম বেশি সবাই জানি ডিপ্রেশন কি, তাই এ নিয়ে আলোচনা করবনা। আমরা আসলে ভালো করে জানিনা কেন ডিপ্রেশন হয়। এমনি এমনি তো এই আসুস্থতা হতে পারে না। সব কারণ জানা না গেলেও কিছু সাধারণ কারণ আছে।

ডিপ্রেশন হতে পারে অপমানবোধ থেকে

মানসিক বা শারীরিকভাবে অবমাননার স্বীকার হলে অনেকে  ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। এই ধরণের অনুভূতি থেকে ডিপ্রেশনের সৃষ্টি হয়।

নিরাপত্তাহীনতা বা একাকীত্ববোধ করা

পারিবারিক কারণে অনেকে হীনমন্যতায় পড়ে। সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকে বিষণ্নতার স্বীকার হয়। তাছাড়া বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধব বা অন্যান্য কাছের মানুষদের সাথে সম্পর্কহীনতা বা মতবিরোধ থেকেও অনেকে বিষণ্ণতায় ভুগে থাকেন।

ডিপ্রেশন বংশগত কারণে হতে পারে

বংশগত পরিবারে কারো ডিপ্রেশন থাকলে তা অন্যদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

বড় কোন রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বড় ধরণের কোন রোগ থাকলে রোগী ডিপ্রেশনের শিকার হতে পারে।

ঔষধের প্রভাব

নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ সেবনের ফলেও কেউ কেউ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়। যেমন ব্রণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত আইসোট্রেটিনিয়ন বা অ্যান্টিভাইরাল “ইন্টারফেরন-আলফা” জাতীয় ঔষধ সেবনেও অনেকে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়। এমন অনেক ঔষধ আছে যেগুলো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে দেয় মস্তিষ্কে।

ডিপ্রেশন আপনাকে অসহায় অবস্থায় পতিত করবে। ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন ধরণের থেরাপি ও চিকিৎসার পাশাপাশি নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

নিজের চেষ্টা না থাকলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। নিজের প্রতিদিনের কাজকর্ম, খাওয়া-দাওয়া, জীবনপ্রণালী এমনকি চিন্তা-ভাবনায় ও পরিবর্তন আনতে হবে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য।

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য নিচের পয়েন্টগুলো সহায়ক হতে পারে-

রুটিনমাফিক চলা

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিনের জীবনকে একটা রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসুন।

প্রতিদিনের কাজ-কর্মকে যদি একটা নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলা যায় তবে তা ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা

লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলুন। ডিপ্রেশনে যেহেতু কোন কাজ করতে ইচ্ছা করে না তাই প্রতিদিন একটু একটু করে কাজ করার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।

নিয়মিত ব্যায়াম করা

প্রতিদিন অল্প কিছু সময় ব্যায়াম করলে তা আপনার শরীর এবং মনকে সুস্থ রাখবে।

ব্যায়াম করা মানে, ম্যারাথন দৌড় টাইপ কিছু না, আপনি যদি প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটাহাঁটি করেন তবুও তা আপনার মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যা আপনাকে ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।

সুষম খাদ্য গ্রহণ

সুষম খাদ্য গ্রহনের মাধ্যমে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি মেলে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ থাকে।

সাইক্রিয়াটিস্টদের মতে, যেসব খাবারে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এ্যাসিড এবং ফলিক এসিড থাকে সেসব খাবার ডিপ্রেশন কমাতে সহায়তা করে।

অনিদ্রা দূর করা

পর্যাপ্ত ঘুম ডিপ্রেশন কমায়। ডিপ্রেশনের রোগীদের নিদ্রাহীনতা দেখা দেয়্। তাই, প্রথমেই ঘুম সমস্যার সমাধান করতে হবে।

প্রতিদিনের জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে নিদ্রাহীনতা দূর করা সম্ভব। প্রতিদিন ঠিক সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

দিনের বেলার হালকা ঘুমের অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। শোবার ঘর থেকে টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল এগুলো সরিয়ে রাখতে হবে।

এভাবেই অনিদ্রা রোগ ধীরে ধীরে দূর করা সম্ভব।

ইতিবাচক চিন্তা করা

ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকলে মানুষের মনে বিভিন্ন রকম নেগেটিভ চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে।

যেমন আমিই বুঝি সবচেয়ে খারাপ, আমার মত দুঃখ কারো নেই, আমি সবার চেয়ে অসুস্থ, আমি ব্যর্থ একজন মানুষ এই ধরণের চিন্তাগুলো সুস্থ হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

তাই এই নেগেটিভ চিন্তাগুলোকে মন থেকে দূর করে পজিটিভলি চিন্তা করার চেষ্টা করতে হবে।

যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করতে হবে। আশাহত হওয়া যাবে না কোনভাবেই।

আনন্দদায়ক কাজের মধ্যে সময় কাটানো

নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে হবে। মজার কোন কাজ। যেমন নতুন কোথাও ঘুরতে যাওয়া, মজার কোন বই পড়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া।

মন ভালো রাখার সবরকম চেষ্টা করতে হবে। মন ভালো থাকলে ডিপ্রেশন কেটে যাবে একসময়।

ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ

ডিপ্রেশন পুরোপুরি না ভালো হওয়া পর্যন্ত ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।

অভিভাবক-দের উদ্দেশ্যে কিছু জরুরি কথা।

অভিভাবক

“বাবা-মা”

আমি তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমার কারণে তোমারা কারো কাছে মুখ দেখাতে পারছ না। আমি শুধু তোমাদের কষ্টই দিলাম। বিশ্বাস কর আমি অনেক পড়েছিলাম কিন্তু কি হল বুঝতে পারলাম না। রেজাল্ট শোনার পর থেকে মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা কেমন দুলছে। একটু আগে তোমারা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলছিলে যাই রেজাল্ট হোক। দুশ্চিন্তা কর না। সেই তোমরা হঠাৎ করে কেমন যেন হয়ে গেলে। আমাকে একটুও বুঝলে না। আমি কি এতই খারাপ যে আমার কথাটাও শুনলে না? আমি আর তোমাদের কষ্ট দিতে চাইনা। আজকের পর থেকে আমাকে নিয়ে আর তোমাদের লজ্জা পেতে হবে না। ভালো থেকো তোমরা।

ইতি

তোমাদের…।

চিঠিটা কি পরিচিত লাগছে আপনাদের কাছে?

২০১৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের পর বেড়েছে আত্মহত্যার সংখ্যা। অনেক ছোট ছোট ভাইবোনেরা চলে গেছে না ফেরার দেশে। অনেকে আত্মহত্যা করেছে এ প্লাস না পেয়ে অনেকে আত্মহত্যা করেছে ফেল করে। ওদের এই চলে যাওয়ার পেছনে কাদের দায়টা সবচেয়ে বেশি? বলতে পারবেন??

আমাদের বয়স যখন স্কুলে পড়ার তখন থেকে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেন অভিভাবক। “তোমাকে এই স্কুলে পড়তেই হবে”। অনেকে কাঙ্ক্ষিত স্কুলে পড়ানোর জন্য ক্লাস ড্রপ দেয়ায় নিজের সন্তানকে। তখন এটা মাথায় একবারও আসে না সে কি অনুভব করছে? সে কি এতো চাপ নিতে পারবে? সেই যে শুরু হয় শিক্ষা যুদ্ধ তা চাকরি যুদ্ধে গিয়েও যেন শেষ হতে চায় না।

প্রতি ক্লাসে তোমাকে প্রথম হতে হবে। ও পারলে তুমি কেন পারবে না? এমন হাজারও প্রশ্নের ভেতরে সন্তানের মনের কথা শোনার মত সময় কারো থাকে না। তাই হয়তো তাদের মৃত্যুর পর তাদের কথা গুলো চিঠির মাধ্যমে দেখতে পান। কোন ছাত্র যদি পরীক্ষায় ১০০ তে ৫০ পায় তাহলে তাকে বকা অথবা অপমান না করে এটা অনুসন্ধান করুন সে কেন কম পেয়েছে? কম পাওয়ার কয়েকটা কারণ থাকাতে পারে। যেমনঃ

১। ঐ বিষয়ে সে মনোযোগী ছিল না।

২। সে ফাঁকি বাজি করেছে।

৩। তার এই বিষয়ে পড়তে ভালো লাগে না।

৪। কোন কারণে সে মানসিক ভাবে ভালো নেই।

উপরের কারণ গুলোর ভেতরে শুধু ২ নম্বর কারণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের বকা দেয়া হয়। কিন্তু কখন বাকি গুলো নিয়ে চিন্তা আসে না। সব গুলো বিষয় নিয়ে তার সাথে কথা বলা দরকার। বকা দিয়ে কখন কোন ভালো কিছু হয় না। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় প্রতিটি শিক্ষার্থী এক ভিন্ন মানসিকতার মধ্য দিয়ে যায়। খুব নড়বড়ে থাকে চিন্তা চেতনাগুলো। উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল অনেক কিছু নির্বাচন করে দেয়। ফলাফল পেয়ে তাই অনেকে হতাশায় পরে যায়। সেই মুহূর্তে তার পাশে না দাড়িয়ে তার সাথে অপমানসূচক কথা বলা সত্যি নির্মম।

পাড়া-প্রতিবেশী এবং আত্মীয়রা বিভিন্ন ধরনের উস্কানিমূলক কথা বলে ফেলেন কোন আশানুরূপ ফল না পাওয়া অভিভাবক দের সাথে। একবার কি এটা তাদের মাথায় আসে না এই কথা গুলোর প্রভাব অন্য কারো উপর আসতে পারে।

সবচেয়ে অবাক লাগে যখন তাদের কথা শুনে আমাদের অভিভাবক খারাপ ব্যাবহার করেন। যারা আপনার সন্তানকে খাওয়ায় না, পড়ায় না তাদের কথা শুনে আপনি আপনার সন্তানের সাথে খারাপ ব্যাবহার করেন, মারধর করেন। একজন শিক্ষার্থী যখন খারাপ ফলাফলের পর মাথা নিচু করে থাকে তখন তাকে আর কি বলার থাকতে পারে। সে যদি যথেষ্ট পরিশ্রম করে থাকে তাহলে তার ফলাফলে আপনি তার চেয়ে বেশি দুখী হতে পারেন না। সুইসাইড নোটগুলো পড়ে অনেক বেশি খারাপ লেগেছে অভিভাবকদের কথা ভেবে। আপনারা কি সন্তানকে আর একটা সুযোগ দিতে পারতেন না। আপনাদের সন্তান আপনাদের ভবিষ্যৎ। তাদের অবহেলা করবেন না।

আপনারা ক্ষমা না করলে আর কেউ নেই পৃথিবীতে ক্ষমা করার। সৃষ্টিকর্তার পর আপনারাই সন্তানের কাছে সব কিছু।

আপনি যদি চেষ্টা করেন তাহলে খুব সহজেই আপনার সন্তানের বন্ধু হতে পারেন। রাগ দেখিয়ে আপনি তাকে হয়তো বাধ্য রাখতে পারবেন, ভয় দেখাতে পারবেন। কিন্তু সে আপনাকে কখন বন্ধু ভাববে না। আর এটাই সবচেয়ে বড় ভুল। ভালবাসা দিয়ে একবার বলেই দেখুন সে আপনার জন্য কি করতে পারে।

আজ সারাবিশ্বে আইএস সন্ত্রাসীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এই সংগঠনটির মূল নিশানা তরুণ তরুণী। কারণ এই সময় একজন মানুষের মানসিক অবস্থা দোদুল্যমান থাকে। খুব সহজে তাদের প্ররোচিত করা যায়। অভিভাবকরা যদি একটু সচেতন হতেন তাদের সন্তানের ব্যাপারে তাহলে আজ নিবরাস ইসলাম, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ  এর মত জঙ্গিদের সৃষ্টি হতনা। হলি আর্টিজানের  হামলায় অভিভাবকদের অবহেলা এবং সচেতনতা দুই দিকই ফুটে উঠেছে।

বাবামায়ের ভালবাসার উদাহরণ যেখানে আয়াজের মত বীর সেখানে অবহেলার উদাহরণ হিসেবে আছে নিবরাসের মত জঙ্গি। এখানে দুজনের বয়সই একরকম।